মুড়াপাড়া জমিদার বাড়ী: ঢাকার কাছেই ঐতিহ্যের হাতছানি

Published : অক্টোবর ১৩, ২০১৭ | 873 Views

ঐতিহ্যের নিদর্শন রুপগঞ্জের মুড়াপাড়া জমিদার বাড়ি

ট্রাভেল নিউজ বিডিঃ প্রায় দেড়শ বছরের কালের স্বাক্ষী হয়ে আছে রূপগঞ্জের জমিদার বাড়ি। প্রাচীন ঐতিহ্য আর স্মৃতি  এখনো আলোড়িত করে এখানে এলে। একসময়ের ঘোড়ার পায়ের ঠক ঠক শব্দ, হাতীর পিটে চড়ে জমিদারদের ভ্রমন, পাইক পেয়াদার পদচারনায় মূখরিত ছিল যে বাড়িটি।

আজ তা শুধু প্রাচীন ঐতিহ্যের স্মৃতি । কালের গহ্বরে প্রাচীন ঐতিহ্যে ঢাকা পড়লেও এর নিদর্শন চিরকাল অম্লান থাকে। রূপগঞ্জের মুড়াপাড়ার জমিদার বাড়িটি তেমনই একটি স্মৃতিচিহ্ন। এ বাড়িটিকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে রূপগঞ্জের ইতিহাস, কৃষ্টি, সভ্যতা ও আজকের এই কোলাহলপূর্ণ জনবসতি। শীতলক্ষ্যা নদীর তীর ঘেঁষে মহাকালের নীরব সাক্ষী হয়ে আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে এ জমিদার বাড়ি। পাখি ডাকা ছায়া সু- নিবিড় পরিবেশে গড়ে ওঠা মনোমুগ্ধকর এ জমিদার বাড়িটি দেখতে কার না মন কাড়ে।

 

মুড়াপাড়া জমিদার বাড়ি

রাজধানী ঢাকা থেকে মাত্র ১৮ কিলোমিটার দূরে নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ থানার মুড়াপাড়া এলাকায় ৬২ বিঘা জমির ওপর এই প্রকান্ড- জমিদার বাড়ি অবস্থিত। জমিদার বাবু রাম রতন ব্যানার্জী তৎকালীন মুড়াপাড়া জমিদার বংশের প্রতিষ্ঠাতা এবং জমিদারদের উর্ধতন ষষ্ঠ পুরুষ। তিনিই মুড়াপাড়া জমিদার বাড়ির গোড়াপত্তন করেন। রাম রতন ব্যানার্জীর পুত্র পিতাম্বর ব্যানার্জী এবং তৎপুত্র প্রতাপ চন্দ্র ব্যানার্জী শাহজাদপুরের জমিদারি ক্রয় করে জমিদারি শুরু করেন। কথিত আছে, জমিদারি ক্রয় সূত্রে প্রতাপ ব্যানার্জীর সঙ্গে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঠাকুরদা প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের প্রগাঢ় বন্ধুত্ব ছিল। ১৮৮৯ সালে প্রতাপ চন্দ্র ব্যানার্জীর পৈতৃক এজমালি পুরনো বাড়ি ত্যাগ করে আলোচ্য এ প্রাসাদের পেছনের অংশ নির্মাণ করে বসবাস শুরু করেন। প্রতাপ চন্দ্র ব্যানার্জীর পুত্র বিজয় চন্দ্র ব্যানার্জী ১৮৯৯ সালে প্রাসাদের সম্মুখ অংশের একতলা ভবন নির্মাণ ও সেখানে ২টি পুকুর খনন করার পর হৃদরোগে মারা যান। তিনি ছিলেন এ অঞ্চলের প্রথম গ্র্যাজুয়েট। বিজয় চন্দ্র ব্যানার্জীর দুই সুযোগ্য পুত্র জগদীশ চন্দ্র ব্যানার্জী ও আশুতোষ চন্দ্র ব্যানার্জী ১৯০৯ সালে প্রাসাদটির দোতলার কাজ সম্পন্ন করেন। এ অঞ্চলে জগদীশ চন্দ্র ব্যানার্জীর নাম সমধিক প্রসিদ্ধ। কারণ তিনি দু’বার দিল্লির কাউন্সিল অব স্টেটের পূর্ববঙ্গ থেকে সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। জমিদার জগদীশ চন্দ্র ব্যানার্জী প্রজা সাধারণের কল্যাণসাধনের জন্য স্থাপন করেছেন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও পুকুর। জমিদারদের আয়ের উৎস বলতে প্রজার ওপর ধার্যকৃত খাজনা আদায়, বন জঙ্গল এবং সুপারির বাগান। ১২০০ বঙ্গাব্দে এসে প্রজাদের ওপর শুরু হয় অত্যাচার-নিপিড়ন,ক্ষমতার অপব্যবহার। সুন্দরী মেয়ে, ঘরের বধূ, এদের ওপর লোলুপ দৃষ্টি পড়লে রেহাই পেতো না কোন সুন্দরী যুবতী নারী। ধীরে ধীরে অত্যাচারের মাত্রা বাড়তে থাকে। আর আজো সেসব রসময় কাহিনী অত্যাচার নির্যাতন প্রভাবের গল্প গ্রামাঞ্চলে কল্পকাহিনীর মতো ছড়িয়ে আছে। জমিদারি প্রথার শেষ দিকে নানাভাবে বিদ্রোহের পটভুমি তারই অংশ।

১৯৪৭ সালে তৎকালীন জমিদার জগদীশ চন্দ্র ব্যানার্জী সপরিবারে কলকাতায় চলে যান। ফলে জগদীশ চন্দ্র ব্যানার্জীর প্রতাপশালী সেই রাজবাড়িটি শুন্য হয়ে যায়।
১৯৪৮ সালে এই ঐতিহ্যবাহী বাড়িটি সরকারের দখলে চলে আসে। তৎকালীন সরকার এখানে একটি হাসপাতাল স্থাপন করে। কিছুকাল এটি কিশোর সংশোধনী কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। পরে ১৯৬৬ সালে এখানে হাইস্কুল ও কলেজ স্থাপিত হয়। বর্তমানে এই জমিদার বাড়িটি মুড়াপাড়া ডিগ্রি কলেজ হিসেবে ব্যবহহৃত হচ্ছে। বিশাল দোতলা এ জমিদার বাড়িটিতে রয়েছে মোট ৯৫টি কক্ষ। নাচঘর, আস্তাবল, উপাসনালয়, ভান্ডার, কাচারি ঘরসহ সবই। বিশালাকৃতির প্রধান ফটক পেরিয়ে ঢুকতে হয় ভেতরে। অন্দর মহলে রয়েছে আরও ২টি ফটক। সর্বশেষ ফটক পেরিয়ে মেয়েদের স্নানের জন্য ছিল শানবাঁধা পুকুর। পুকুরের চারধার উঁচু দেয়ালে ঘেরা। এখানে প্রবেশ বাইরের লোকদের জন্য ছিল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সচরাচর কোন পুরুষ যেত না সেখানে। তখন এটি ছিল নীরব এক অন্তপুরী। কিন্তু বর্তমান দৃশ্যপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। অন্দর মহল থেকে শুরু করে জমিদার বাড়ির সম্পূর্ণ সীমানায় থাকে দর্শনার্থীদের ভিড়। পুকুরের চার ধার মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়। বাড়ির সামনে রয়েছে আরও একটি বিশাল পুকুর। পুকুরটির চারদিক নকশি কাটা ঢালাই লোহার গ্রিল দিয়ে ঘেরা। আর চারদিকে চারটি শানবাঁধানো ঘাট। পুকুরজুড়ে পানি টলমল করে। এত স্বচ্ছ পানি বোধ করি এতদাঞ্চলে নেই। পানিতে জমিদার বাড়ির প্রতিচ্ছবি ঢেউয়ের তালে দুলছে। মূলত এ পুকুরটি তৈরি করা হয়েছে বাড়ির সৌন্দর্য বর্ধন এবং পুরুষ মেহমানদের গোসনের জন্যই। পুকুরসংলগ্ন মন্দির। মন্দিরে বড় দু’টি চূড়া রয়েছে। তা প্রায় ৩০ ফুট উঁচু। এর প্রবেশ দ্বারগুলো খিলান দিয়ে নির্মিত। মন্দিরের মূল কক্ষ বেশ ছোট এবং অন্ধকার। মন্দিরের পাশ ঘেঁষে রয়েছে ছায়াঘেরা শান্ত-শ্যামল আম্রকানন। গাছগুলো বেশ পুরনো। একই মাপের ঝাঁকড়ানো গাছ। ডাল-পালা ছড়ানো, অনেকটা ছাতার মতো। অসংখ্য গাছ। প্রায় প্রতিটি আম গাছের গোড়া পাকা করা। এছাড়া জমিদার বাড়ির প্রবেশমুখেই রয়েছে সারি সারি ঝাউ গাছ।

ভ্রমনপিপাসু ব্যাক্তিরা এ জমিদারবাড়িটি দেখতে চাইলে ঢাকা থেকে আসতে সময় লাগে মাত্র ৪০/৫০ মিনিট। বাসে কিংবা সিএনজি প্রাইভেট কারে করে আসতে পারেন এখানে। রাজধানী ঢাকার সায়েদাবাদ,গুলিস্থান অথবা যাত্রাবাড়ি থেকে মেঘলা,গ্লোরী, আসিয়ান পরিবহন অথবা নরসিংদী ভৈরবগামী যে কোন বাসে চেপে রূপসী বাসষ্টান্ড অথবা ভুলতা  এলে ভাড়া লাগবে ৩০ টাকা। সে ক্ষেত্রে সিএনজিতে লাগে ৩শ’ থেকে ৪০০ টাকার মতো। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের রূপগঞ্জের রূপসী বাসস্ট্যান্ড কিংবা ভুলতা পর্যন্ত এলে বেবিট্যাক্সি অথবা রিকশাযোগে পিচঢালা রাস্তায় সহজেই আসা যায় এ জমিদার বাড়িতে। রাজধানীর ডেমরাঘাট হয়ে উত্তর দিকের রাস্তা ধরে মাঝিনা ঘাট পাড় থেকে নৌকায় শীতলক্ষ্যা নদী পার হলেই রূপগঞ্জের এই প্রাচীন ঐতিহ্যের স্মৃতি বিজড়িত কালের সাক্ষী হয়ে আজো দাড়িঁয়ে আছে এই  জমিদার বাড়ি।

সূত্র: ইন্টারনেট

Published : অক্টোবর ১৩, ২০১৭ | 873 Views

  • img1

  • অক্টোবর ২০১৭
    সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
    « সেপ্টেম্বর   নভেম্বর »
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫
    ১৬১৭১৮১৯২০২১২২
    ২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
    ৩০৩১  
  • Helpline

    +880 1709962798