বাংলাদেশে পর্যটন: এই সময়ের সমস্যাগুলো

Published : আগস্ট ১৬, ২০১৭ | 904 Views

ট্যুরিজম আড্ডায় যেসব সমস্যার কথা উঠে এসেছিলো।

গত ২৪ জুলাই রাজধানীর গুলশানে সিগনেচার রেস্টুরেন্টে দি  বাংলাদেশ ট্রাভেল, ট্রাভেল টিউন ও বে পিয়ারেল ট্যুরিজম এর আয়োজনে অনুষ্ঠিত আড্ডায় এবং ১৮ আগষ্ট বনানীর হোটেল গ্যালেসিয়াতে অনুষ্ঠিত টকে দেশের ট্যুরিজম সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দেশের ট্যুরিজমের বর্তমান সমস্যাগুলো তুলে ধরেন।

আলোচনায় যেসব সমস্যা উঠে এসছে  সেগুলো নিন্মরুপ

১. দেশের ট্যুরিজম এলাকাগুলোকে আন্তজাতিকভাবে তুলে ধরা হয়না। অনলাইনে পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়া যায়না।

২. হোটেলগুলোতে রুমট্যারিফ প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশী। সেবার মানও সবক্ষেত্রে ভালো নয়। পর্যটন এলাকাগুলোতে নিরাপত্তার অভাব।

৩. দেশে সরকার ট্যুরিজম ব্যবসায়ী এবং পেশাজীবিদের জন্য অনুকুল বা সহযোগী কোনো নীতিমালা বা সুযোগ সুবিধা প্রণয়ন ও প্রদান করে না। তারা একরকম ব্যক্তি পর্যায়ে যা সম্ভব কাজ করেন। এবং বিদেশী বাংলাদেশ দূতাবাস গুলো খুম কম সময়ে এ ব্যাপারে কোনো ভূমিকা রাখে।

৪. বেশীরভাগ হোটেল মালিক মনে করেন। তিনি হোটেলের মালিক তিনি কেন কাস্টমারের সাথে কথা বলবেন? তারা টেকনোলজি পছন্দ করেন না। অনেকক্ষেত্রে কর্মচারীরা নিজেরা বাড়তি সুবিধা পাওয়ার জন্য মালিক পক্ষকে ভুল বুঝিয়ে থাকেন।

৫. হোটেল মালিকগণ প্রফেশনাল ও পেশাজীবি কর্মী নিয়োগ না করে আত্মীয় স্বজন দিয়ে হোটেল চালাতে পছন্দ করেন। বেশীর মালিকের হোটেল ব্যবসাটা মূল ব্যবসায় নয়। আবার কোনো ক্ষেত্রে দেখা যায় পর্যটন বা হসপিটালিটি নিয়ে পাশ করা ছাত্রদের ব্যবহারিক জ্ঞান কম। ফলে হোটেল কতৃপক্ষ তাদেরকে কম বেতন অফার করে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে উল্টো টাকা চায়। যা খুব লজ্জার ও অপমানের।

৬. অনেকে এলাকায় যাওয়ার জন্য রাস্তাঘাট ভালো নয়। ট্রাফিক জ্যাম একটা সমস্যা। কক্সবাজার যেতে কখনো কখনো ১৬/১৭ ঘন্টা সময় লাগে। পটিয়ায় যে ট্রাফিব জ্যাম পড়ে সেটা সমাধানের জন্য আনোয়ারা দিয়ে বিকল্প সড়কগুলোকে উন্নত করা দরকার। কিন্ত তেমন কোনো পরিকল্পনা নেয়া হয়নি।

৭. ট্যুর অপারেটর গণ গাইডদের ন্যায্য মুজুরী দেননা। পর্যটন পেশাজীবিদের চাকরীও খুব নড়বড়ে। আবার অনেক ক্ষেত্রে কর্মীরা কাজ শেখার পর হয়তো অন্য কোম্পানীতে চলে যায় নয়তো নিজেরা ব্যবসায় খুলে বসে।

৮. কিছু অপেশাদার লোক ফেসবুকে পেইজখুলে কম দামে বাজে সেবা দিয়ে পর্যটন বাজার নষ্ট করে দিচ্ছে। অথচ এগুলোর উপর সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। তিন মাস কিংবা তিন দিনের অভিজ্ঞতা নিয়ে অনেকে ব্যবসায় শুরু করে দিয়েছে যা বাজারের জন্য মোটেই ভালো নয়। ট্যুরিষ্ট অনুযায়ী সার্ভিস প্রোভাইডার বেড়ে গেলে বাজারে ভারসাম্য নষ্ট হবে। অনেক উদ্যোক্তা ব্যবসায় ছেড়ে দেবে। সেটা পুরো শিল্পের উপর প্রভাব ফেলবে।

৯. যারা পর্যটন ব্যবসায় করে দেশকে তুলে ধরেন। তাদের জন্য কোনো ট্যাক্স ফ্রি সুবিধা, কম ট্যাক্সে গাড়ি আমাদনী সুবিধা, কোনো পদক, কোনো পুরষ্কার এমনকি কোনো প্রনোদনার ব্যবস্থাও নেই। সারা বিশ্বে পর্যটন মন্ত্রণালয় গুরুত্ব পেলেও বাংলাদেশে পায়না। তাদের বাজেটও যৎসামান্য। এবং সিভিল এভিয়েশন এর সাথে শরীক মন্ত্রণালয়। সিভিল এভিয়েশন এর বিশাল লোকসানের বোঝা দেখিয়ে পর্যটন খাতে সরকারী বাজেট কমিয়ে দেয়া হয়।

১০. দেশে একটি পর্যটন বিশ্ববিদ্যালয় থাকার দরকার সেটা নেই। নেই বিদেশীদের জন্য কমওফোট জোন। শহরগুলোতে ট্যুুরিস্ট বাস বা কারের ব্যবস্থা নেই। হোটেল ভাড়ার উপর নেই সরকার কিংবা মন্ত্রনালয়ের কোনো নিয়ন্ত্রণ।

১১. ট্রাভেল এজেন্টদের তালিকাভুক্তির জন্য যেমন সিভিল এভিয়েশন কতৃপক্ষ রয়েছে। তেমনি ট্যুর অপারেটরদের তালিকাভূক্তির জন্য কোনো কতৃপক্ষ নেই। যেটা থাকা দরকার।  ১৬ কোটি মানুষের দেশে ১০০০ টি পর্যটন স্পট উন্নয়নের জন্য প্রতিটি বিভাগ ভিত্তিক আলাদা আলাদা ট্যুরিজম বোর্ড দরকার। তাহলে প্রতিযোগিতামূলক উন্নয়ন হবে সেটা নেই।

১২. বিভিন্ন ট্যর এলাকায় গেলে সুভেনির বা স্মারকপন্য পাওয়া যায়না। পর্যটনের সাথে স্মারক পন্যকে তুলে ধরার কোনো উদ্যোগ নেই। এমনকি সরকারী রেস্ট হাউসগুলোতে দেশীয় পন্যের পসরা সাজানোর কোনো ব্যবস্থা নেই। প্রতিটি এলাকার সংস্কৃতি, খাদ্য ও উৎপাদিত পন্যকে সে এলাকার পর্যটন স্থানের সাথে তুলে ধরার কোনো উদ্যোগ নেই।

১৩. পর্যটন কি এই সম্পর্কে বেশীরভাগ মানুষের ধারণা পরিষ্কার নয়। অনেকে মনে করেন দৃশ্য দেখা বা কোনো স্খানে ঘুরতে যাওয়াই পর্যটন। এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ে না।

১৪. বিভিন্ন প্রত্নতাত্বিক স্থাপনায় গেলে দেখা যায়। সেখানে বিদেশীদের জন্য বাড়তি মূল্য তালিকা রয়েছে। বাস্তবতা হলো বাড়তি মূল্য তালিকা নেয়ার মতো অবস্থায় আমরা এখনো যাইনি। ট্যুর গাইড ও পেশাজীবিদের জন্য সরকার বা কোনো বেসরকারী উদ্যোগে ঋণ কিংবা সাহায্য বা পুরষ্কারের ব্যবস্থা নেই। নেই হসপিটালিটি ছাত্রদের চাকরী পাওয়ার কোনো মাধ্যম।

১৫. কোনো অপারেটর এর মাধ্যম ছাড়া স্বাধীনভাবে কোনো পর্যটক বাংলাদেশ ঘুরতে এলে তারা এক জায়গায় সব সেবা পাবে এমন কোনো প্লাটফরম দেশে তৈরী হয়নি।    বহিবিশ্বে বাংলাদেশ বিরোধী প্রচারণার কারণে কিছুটা ক্ষতিগ্রস্থ হয়।

১৬.   প্রতিটি জেলায় প্রবেশ মুখে সে জেলার পরিচিতি ও সেখানে কিকি পর্যটন সুবিধা আছে। সেগুলো তুলে দেয়ার কোনো ব্যবস্থা আজ অবধি নেয়া হয়নি।

১৭.  পর্যটন ভিত্তিক নাটক ও টিভি অনুষ্ঠান তৈরী হলেও। আন্তজাতিক মানের মুভি তৈরী হওয়া দরকার যেটাতে দেশের পর্যটনকে গল্পের মাধ্যমে তুলে ধরা হবে। আজ অবধি সে রকম কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি।

১৮. জঙ্গি হামলার কারণে পর্যটন ক্ষতিগ্রস্থ হয়।

১৯. আমাদের দেশের জনগনের বা যেসব স্থানে ট্যুরিস্ট যায় সেসব এলাকার মানুষের মানসিকতা পর্যটন বান্ধব নয়। তারা সেবার বদলে শুধু ব্যবসার কথাই চিন্তা করে। এবং বিদেশী ট্যুরিস্টদের মূল্যবোধ এবং সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল নয়।

২০. সরকারী পর্যটন প্রতিষ্ঠানে পর্যটন মনস্ক লোকজন নিয়োগ দেয়া হয়না। ফলে তারা নিজেরা পর্যটন না বোঝার কারণে পর্যটনের জন্য কল্যাণকর কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়না।

২১. দেশের ট্যুরিজম স্পটগুলোকে তালিকাভূক্তিকরণ, সিজন, নিরাপত্তা, ধরণ, আকার ও প্রকার অনুসারে শেনীবদ্ধ করার কাজ আজ অবধি করা হয়নি।

২২. আজ অবধি পর্যটন নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হয়নি।

২৩. দেশীয় ট্যুরিস্টরা পর্যটন স্পটগুলোতে প্লিাস্টিকবজ্য ফেলে ক্রমশ নোংরা ও অযোগ্য করে তুলছে এ ব্যাপারে কোনো কাযকরী উদ্যোগ নেয়া হয়নি।

২৪. সরকারী সার্কিট হাউস ও ডাকবাংলোগুলো ব্যবহারের ক্ষেত্রে নানা সমস্যা দেখা দেয়।

২৫. সাধারণ মানুষকে আজ পর্যন্ত পর্যটন এর সাথে সম্পৃক্ত করে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। হলেও সেটা কার্যকর ফল বয়ে আনতে পারেনি।

২৬. সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশী পর্যটক আকর্ষনে কোনো কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারছেনা। যেসব উদ্যোগ নিচ্ছে তা শুধু দেশের ভেতরেই।

২৭. বিভিন্ন গ্রুপ দল বা এসোসিয়েশন এর দলাদলির কারণে সরকারের দৃষ্টিতে সমস্যাগুলোকে সঠিকভাবে আনা যায়নি।

২৯. সবসময় বি-টিম থেকে মন্ত্রী দেয়া হয়। এবং তরুন ও কর্মক্ষম পর্যটন মন্ত্রীর অভাবে অনেক কাজ করা যায়না।

৩০. পর্যটন সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য খুব সহজে পাওয়া যায়না। ফলে দেশে পর্যটন নিয়ে কোনো উল্লেখযোগ্য গবেষণা হয়না। আর হলেও সেটা সঠিকভাবে তুলে ধরা হয়না।

 

Published : আগস্ট ১৬, ২০১৭ | 904 Views

  • img1

  • Helpline

    +880 1709962798