বাঙালীর উৎসব সংস্কৃতির সমান্তরাল ধারা

Published : জুলাই ২, ২০১৭ | 1331 Views

বাঙালীর উৎসব সংস্কৃতির সমান্তরাল ধারা
জাহঙ্গীর আলম শোভন

শতবছরের ইতিহাসে সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং ধর্মীর পালাবদলের মধ্য দিয়ে বাঙ্গালী সংস্কৃতির অবিরাম যাত্রাপথ। অদ্ভুৎএবং দ্বিমাত্রিক বৈপরত্য বাঙালী সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য হয়ে দাড়িয়েছে যেন। আজকের এই লগ্নে দাড়িয়ে বাঙালী সংস্কৃতি তথা বাঙালী মুসলমান বা বাংলাদেশের সংস্কৃতি বৃত্ত তৈরী করলে বড়ো দাগে কয়েকটা বিন্দু চোখে পড়বে। সার্বজনীন উৎসবের রঙীন তিনটি পর্ব রোজার ঈদ বা ঈদ উল ফিতর, কুরবাণীর ঈদ বা ঈদ উল আযহা ও বাংলা নববর্ষ বা পয়লা বৈশাখ। অন্যরঙে রাঙালে আরো ৩টি বিন্দু ভেসে উঠবে তাহলো ভাষা দিবস, স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবস। বৃত্তটাকে আর একটু বড়ো করলে দূর্গাপূজার রঙটা চোখে পড়বে আরো একটু টানলে আসবে বড়োদিন ও বৌদ্ম পূর্ণিমা।

তথাপি দুই ঈদের আনন্দ সাবজনীনতা, ঈদের জন্য সকলের প্রতীক্ষা জাতির সমস্ত মানুষের সম্পৃক্ততা, উদযাপন সবই অন্য যেকোন উৎসবের চেয়ে আলাদা এবং পরিসরে বৃহৎ। মুসলিমের শাস্ত্রসিদ্দ উৎসব হলেও বাংলাদেশে ঈদের আলাদা রং, রুপ ও স্বাদ আছে এবং অন্য ধর্মীরাও সে অনুভূতির ভাগ পায়। এদুটি বাস্তব এবং বৃহৎকারণে ঈদ উৎসব আমাদের জীবনের এক বিশাল অধ্যায়। যার স্পর্শ এবং প্রভাব গভীরতম।  অনেকে আজকাল পহেলা বৈশাখকে সবচেয়ে বড়ো সার্বজনীন উৎসব মনে করেন কিন্তু এটা দেখা যায় শহরে, একে শহরকেন্দ্রীক একটা ঈদও বলা যেতে পারে। গ্রামের একজন সাধারণ কৃষানীর জীবনে হয়তো এর কোনো প্রভাব নেই।

এসবের মাঝে বাঙালী সংস্কৃতির দ্বিমাত্রিক যে বৈশিষ্ট্যের কথা বলা হয়েছে তা বিপরীত হয়েছে এ কারণে সেখানে কোনটির স্থানে কোনটি স্থাপিত হয়নি অথবা কোনটির পরিবর্তে কোনটি আসেনি। বরং প্রতিটি সংস্কৃতি আপন গতিতে বিকশিত হয়েছে। স্থান কাল ও লোকগোষ্ঠির প্রেক্ষিতে হয়তো কোনোটা কম কোনোটা বেশী আলো ছড়িয়েছে।

প্রাক মুসলিম যুগে জাত-পাত কৌলন্যের কারণে জাতভেদে মানুষের জীবনাচার ও সংস্কৃতি ভিন্নছিলো। উঁচু জাত আর নিচু জাতের আলাদা কৃষ্টি যেনো আলাদা দ্ুিট স্রোত। রাজার রংমহল আর কৃষকের বা জেলের উঠান সমান্তরালে সংস্কৃতির আধার ছিলো ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণীর মাঝে। বৈদিক যুগেও কাঠামোগত ভাবে একইরকম ছিলো। যুক্ত হলো ব্রাহ্মনের কীর্তণ।
মধ্যযুগের শেষের দিকে সংস্কৃতি হাটতে শিখলো রাজারটা এবং প্রজারটাও। রাজার বাঈজীদের এ জমিদার বাড়ী থেকে সে জমিদার বাড়ী যাতায়াত শুরু হলো। প্রজাদের যাত্রাপালা কুম্ভ কীর্তণ এপার ওপার করলো। পাড়া মহল্লায় ছড়ালো। কিন্তু দ্ধুারার বিভক্তি আর ঘুচলোনা।
ইসলামের আবির্ভাব নতুন ধারা তৈরীতে যতটা না ভূমিকা রাখলো তার চেয়ে বেশী ভূমিকা রাখলো ইসলামের জাগরণ বা বিকাশ। হিন্দু ও মুসলিমের আলাদা সংস্কৃতি আছে এবং তা পরষ্পর বিপরীত এমন ধারনাই সমাজে বিস্তৃত হলো।  যদিও বিপরীত দুটো সংস্কৃতি কিন্তু একে অপরের মুখোমুখি দাড়ায়নি প্রথম দিকে। বরং হিন্দুদের মাজারভক্তি আর মুসলিমদের মন্দিরে মানত এগুলো সেদিন পর্যন্ত এ বাংলায় খুব সহজভাবেই প্রচলিত ছিলো।

অবশ্য মুসলিম জনগোষ্ঠির যে সংস্কৃতি তাতে পূর্বেকার সংস্কৃতির অনেক কিছুই থাকলো। প্রথম দিকে একটু বেশীই ছিলো। এই বেশীর মধ্যে ছিলো দেব-দেবীর নামে মানত, ঢাক-ঢোল পিটানো, বাজিফুটানো এবং বিয়ে অনুষ্ঠানের নানা উপ-আনুষ্ঠানিকতা। আবার সানতনী সংস্কৃতিতেও নতুনের বাতাস লেগেছে তবে তা নেহায়েত ও যৎসামান্য এবং সেটা সংস্কৃতিতে নয় আচারে ঘোমটা দিতে শুরু করলো গাঁয়ের বধূ। পরসঙ্গ আগের চেয়ে বেশী পাপের মনে হলো।
তা সত্বেও দ্ুিট সংস্কৃতিক ধারা আলাদা ভাবেই বিকশিত হয়েছে। এর মধ্যে সে রাজা-প্রজার সংস্কৃতি কিছুটা অঙ্গন ভেঙ্গেছে। যাত্রা পালার পাশাপাশি নাটক হতো, সেখানে নানা শ্রেণী পেশার মানুষ আসতো। সঙ্গীতের আসর বসতো। তবে প্রান্তজনের সংস্কৃতি এতাদিনেও জাতে উঠেনি। বরং বলা হতো যাত্রা দেখে ফাত্রা লোক। কবিগান, পালাগান এক্ষেত্রে একটু অগ্রসর ছিলো। দ্ুেশ্রণীর মানুষই এ আসরে শ্রোতা হিসেবে জুটতো। কেউ শুধু শ্রোতা, কেউ সমজদার। রেকর্ড করা গান বের হওয়ার পর সংস্কৃতির নতুন ধারায় সকল ধরনের মানুষের মেলবন্ধন তৈরী হলেও আনুষ্ঠানিক সংস্কৃতিতে এখনো বিরাট ব্যবধান বা ভিন্নতা রয়ে গেছে। সে ব্রিটিশ ভারতেও ক্লাবে শুধু ইংরেজদের প্রবেশাধিকার ছিলো ভারতীয়দের নয়।

অবশ্য পশ্চিমা ধাঁচের ক্লাব সংস্কৃতিতে আজো এ সংস্কার বিদ্যমান। আজ দেশের সেইসব ঢাকা ক্লাব, গুলশান ক্লাব, উত্তরা ক্লাব, চিটাগং ক্লাব এসব জায়গায় এলিট শ্রেণীর লোকদেরই কেবল প্রবেশাধিকার রয়োছে।

বর্তমান সময়ে শ্রেণীভেদ সংস্কৃতির রেশ কিছুটা সেকারণে আজো রয়ে গেছে। ধর্মীয় সংস্কৃতিরও দুই দ্বারা পূর্ণ মাত্রায় বিদ্যমান। এর বাইরে সংস্কৃতির আরো দুই ধরনের ধারা বহাল তবিয়তে আছে। এর একটি হচ্ছে বিনোদন সংস্কৃতিও শৈল্পিক বা নান্দনিক সংস্কৃতি বনাম প্রথাগতদের সংস্কৃতি। এর পাশা পাশি পরবর্তী দ্ুিট সংস্কৃতি ধারা পাশাপাশি থাকবে বা প্রতিযোগীতা করবে তার রুপটি একেবারে পরিষ্কার হয়ে গেছে তা হলো দেশীয় সংস্কৃতি বনাম বিদেশী সংস্কৃতি। সংস্কৃতির দ্বিমাত্রিক ধারায় এটাই কিন্তু শেষ কথা নয় এর পরের পর্ব হলো প্রযুক্তি নির্ভর সংস্কৃতি ও প্রত্যক্ষ সংস্কৃতি চর্চা। এটা উত্তর প্রজন্মের ভাইটাল পয়েন্ট। এর মধ্যে মৌলিক বনাম মিশ্র সংস্কৃতির একটা ধারাও বহমান। তাহলে দ্বিমাত্রিক সংস্কৃতির পরিবর্তণটা এমন যা নিচে দিখানো হলোÑ

প্রথম ধাপ : গোষ্ঠিক সংস্কৃতি বনাম ব্যক্তিক সংস্কৃতি।
দ্বিতীয় ধাপ : প্রাকৃত সংস্কৃতি বনাম রাজকীয় সংস্কৃতি।
তৃতীয় ধাপ : জন সংস্কৃতি বনাম ধর্মীয় সংস্কৃতি।
চতুর্থ ধাপ : স্থানীয় সংস্কৃতি বনাম আগতের সংস্কৃতি।
পঞ্চম ধাপ : হিন্দু সংস্কৃতি বনাম ইসলামী সংস্কৃতি।
ষষ্ঠ ধাপ : ভারতীয় সংস্কৃতি বনাম পশ্চিমা সংস্কৃতি।
সপ্তম ধাপ : দলিতের সংস্কৃতি বনাম কুলীনের সংস্কৃতি।
অষ্টম ধাপ : বিনোদন সংস্কৃতি বনাম শৈল্পিক সংস্কৃতি।
নবম ধাপ : প্রগতিশীল সংস্কৃতি বনাম প্রথাগত সংস্কৃতি।
দশম ধাপ : প্রচলিত সংস্কৃতি বনাম পরিবর্তিত সংস্কৃতি।
একাদশ ধাপ : লোকজ সংস্কৃতি বনাম আধুনিক সংস্কৃতি।
দ্ভাদশ ধাপ : দেশী সংস্কৃতি বনাম বিদেশী সংস্কৃতি।
এয়োদশ ধাপ : মৌলিক সংস্কৃতি বনাম মিশ্র সংস্কৃতি।
চর্তুদশ ধাপ : প্রযুক্তি বা যান্ত্রিক সংস্কৃতি প্রত্যক্ষ সংস্কৃতি।

বৈচিত্রে, বুননে ও বিষয়ে এমন সংস্কৃতি প্রবনতা বিরল। সংস্কৃতির এতসব ধারার মধ্যে অনেক ধারাই এখনো জীবিত আছে। তথাপি সে ধারাটি তার বিপরীত বা পূরক ধারাটির সাথে এক ধরনের প্রতিযোগিতা অথবা সহযোগিতার মাধ্যমে পথ চলছে। ফলে দ্বি-মাত্রিক তত্বটা বহাল তবিয়তেই আছে। চর্তুদশীর দিনরাত দুটোই পার করছো আমাদের সংস্কৃতি।

এতদসত্বেও এই সময়ে এসে আমাদের বিশেষকরে দুই ঈদ, বৈশাখ ও জাতীয় দিবস সমস্ত মানুষের সংস্কৃতি হয়ে গেছে। এই কটি উৎসবে দ্বিমাত্রিক বিষয়গুলো মূখ্য না হয়ে বরং একরৈখিক এক সামক্ষিক মেরকরন তৈরী করে নানা শ্রেণী পেশার মানুষের মাঝে।
ধর্ম-অধর্ম, যন্ত্র-অন্ত্র, দেশী-বিদেশী, লোক-অজিত, মৌলিক-মিশ্র এ কয়টি ধারা মাঝেই ঈদ সংস্কৃতি বিকশিত হয়েছে নতুন আলোয় আপন রঙএ। এবং মাত্রিক-বিভক্তির উর্ধেধ অবস্থান করছে।

Published : জুলাই ২, ২০১৭ | 1331 Views

  • img1

  • জুলাই ২০১৭
    সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
    « জুন   আগষ্ট »
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫১৬
    ১৭১৮১৯২০২১২২২৩
    ২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
    ৩১  
  • Helpline

    +880 1709962798