পরবাসিনী: বাংলাদেশের প্রথম সাইন্স ফিকশন মুভি

Published : মে ৫, ২০১৭ | 2300 Views

বাংলা ছবিতে নতুনত্ব

বাংলাদেশের প্রথম সাইন্স ফিকশন মুভি: পরবাসিনী

জাহাঙ্গীর আলম শোভন

 

প্রথমে এই ছবির কয়েকটি দিক একেবারে টপটেন তালিকা করে দেখে নেয়া যাক আগে

১. পরবাসিনী বাংলাদেশের প্রথম সাইন্সফিকশন মুভি। সম্ভবত বাংলাভাষারও প্রথম সাইন্সফিকশন মুভি।

২. পরবাসিনী ছবিটি প্রায় ৫ বছর সময় নিয়ে তৈরী করা হয়েছে। নানা ঘাত প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে।

৩. সাম্প্রতিক সময়ে নেহায়েত একটি সাইন্স ফিকশন ছবিকে সেন্সর বোর্ড ২ বছর আটকে রেখেছে, ছবিটির নাম পরবাসিনী।

৪. পরবাসিনী ছবিটিতে ফ্রান্স, জার্মানি ও ইতালিসহ ৫টি দেশের শিল্পীরা অভিনয় করছেন।

৫. পরবাসিনী  ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড, বেলজিয়াম, জার্মানি, ইতালি ও ভারতসহ বিশ্বের দশটি দেশে শুটিং করা হয়েছে।

৬. এই ছবিটি কোনো দেশী বা বিদেশী সিনেমার গল্প বা ধারণার সাথে মোটেই মিলবেনা।

৭. পরবাসিনীতে ভিনগ্রহের যে কাল্পনিক অধিবাসীদের দেখানো হয়েছে সেটাও একেবারেই তাদের নিজস্ব বা ইউনিক। এবং এবারই প্রথম কোনো ছবিতে এলিয়েনরা আপনার মাতৃভাষা বাংলায় কথা বলবে।

৮. এই বাংলা ছবিটি বাংলাদেশ ও ফ্রান্সের যৌথ প্রযোজনায় তৈরী হয়েছে।

৯. এটাই প্রথম কোনো বাংলা ছবি যেটাতে ভিনগ্রহের বাসিন্দার সাথে মানুষের প্রেম দেখানো হয়েছে।

১০. এই ছবিতে যে স্পেসশীফ ডিজাইন করা হয়েছে। সেটা হলিউড কিংবা বলিউড যেকোনো ছবির ফ্লাগশীপ থেকে আলাদা। বলতে পারেন নির্মাতারা নিজেদের কল্পনাশাক্তি ব্যবহার করেছেন।

পরবাসিনী ছবি আজই হলে বসে দেখলাম। সুন্দর একটি গল্প ছিলো। অনেক আয়োজন ছিলো। নতুন নতুন ট্রিটমেন্ট ছিলো। একটি সাইন্স ফিকশন ছবিতে নাচ গান কৌতুক এমনকি আইটেম গানও রাখা হয়েছে। মোটকথা ছবিটিকে উপভোগ্য করতে চেষ্টার কোনো কিছুই বাদ রাখেনি নির্মাতারা।

প্রত্নতত্ত্ববিদ চর্যাপদ সেন ২০ বছর পর গবেষনার কাজে ফিরে এসে  দেখা পান তার প্রেমিকা রি সেনের।  তারা বলতে থাকেন এই ঘটনার পুরো বৃত্তান্ত।   বাংলাদেশী বিজ্ঞানীরা একটি গ্রহ আবিষ্কার করেছে। এই খবর পৌছে গেছে এলিয়েনদের কাছে।  তারা লেগেছে মানুষের পেছনে। বাংলাদেশের একটি পরমানবিক কেন্দ্র আছে সেটা মৌলভী বাজারে। সেই মাধবপৃুর পরমানবিক কেন্দ্র তাদের নিশানা। ইতোমধ্যে সেখানে খুন করা হয়েছে পরমানু বিজ্ঞানী মোবাশ্বেরকে। কেন কারা কিভাবে খুন করলো?  কোনো রহস্য জানা যায়নি। শুধু জানা গেছে এলিয়েনদের দেখা গেছে সেখানে। কিন্তু অনেকে সেটা বিশ্বাসই করে না। । তারপর বিশেষ ফোর্স এর অর্নবকে নিয়োগ দেয়া হয় রহস্য সমাধানের জন্য। অর্নব এবং সোহেল ছাড়া অর্নব এর পুরো টিমকে ধ্বংস করে দেয় ভিনগ্রহ থেকে আসা স্পেসশীপ। যারা দেখেছেেএমন ৫ জন স্বাক্ষীর খোঁজে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ঘুরে বেড়ায় অর্নবরুপী ইমন কিন্তু সবার কাছে পৌছার আগে তারা খুন হয়ে যায় কিভাবে খুন হয় সেটা কেউ বুঝতে পারে না। পরে জানা যায় এই ঘটনার স্বাক্ষী আসলে ৭ জন। তাদের একজন হলো ইমনের গার্লফ্রেন্ড রিথ মজুমদার বা নিশা। কিন্তু পরে জানা যায় আসলে সেও একজন এলিয়েন। কিন্তু এটা বিশ্বাস করেনা ইমন। ওদিকে দূর গ্রহ থেকে এলিয়েনরা স্পেসশিপ নিয়ে আসে। আসলে নিশার ভেতরেই লুকানো ছিলো এজন এলিয়েন। ওই এলাকায় তিন তরুনী ঘুরতে গেলে তাদের মধ্যে এলিয়েনরা ঢুকে পড়ে। অন্যদিকে স্পেশাল টিমের সন্দেহ  এসব হত্যাকান্ডোর সাথে নিশা জড়িত । কিন্তু এর মধ্যে নিশার ভেতর থাকা এলিয়েনরক তারা একদিন বের করে নিয়ে যায়। এতে করে নিশা অর্নব এর কাছে ফিরে আসলেও বিপদ কাটে না। কারণ নিশার ভেতর থাকা সে এলিয়েন এর মধ্যে এলিয়েনদের সমস্ত পরিকল্পনার কথা ফাঁস করে দেয় অর্নব এর কাছে। এরপরই ভিনগ্রহের বাসিন্দারা সিদ্ধান্ত নেয় তারা পৃথিবীতে হামলা চালাবে।  এভাবেই তৈরী করা হয়েছে পরবাসিনী ছবির গল্পের প্লট।

বাংলা সাইন্স ফিকশন

আপনি যদি বলিউড বা হলিউড এর ফিকশন কিংবা এনিশেমনযুক্ত ছবির কথা ভাবেন তাহলে এই ছবি নিয়ে বলার কিছু নেই। কিন্তু যদি বাংলাদেশে মেইনস্ট্রিম সিনেমার বস্তাপঁচা একই রকম গল্প, বোম্বে আর তামিল ছবির নকল কাহিনী একই রকম ফ্রেমিং, একই রকম কম্বিনেশন এসবের কথা ভাবেন তাহলে আপনাকে অবশ্যই পরবাসিনীকে এগিয়ে রাখতে হবে।

বর্তমানে ভারতীয় বাংলা সিনেমা বেশ উন্নত হয়েছে। পেশাদার অভিনয়, প্রযুক্তি, নতুনত্বের ছোঁয়া, গল্পের ভিন্নতা ইত্যাদি এক ভিন্নমাত্রা দিয়েছে। বিশবছরের খরা থেকে বেরিয়ে এসেছে বলতে পারেন। তারপরও দেখবেন ফ্রেমিংগুলো একই রকম, একশনগুলো সেই তামিল মুভি টাইপের, গানগুলো তাদের চিত্রায়ন ভিন্ন ভিন্ন লোকেশন হওয়ার পরও মনে হয় একই রকম। সেখানেও কয়েকটি জায়গায় পরবাসিনী আলাদা সেটা হলো গল্প, ভাবনা এবং ফ্রেমিং। তাই এই জায়গাতেও আমি পরবাসিনীকে এগিয়ে রাখব। এই ছবির ফ্রেমিংগুলোতে হলিউডি একটা টাচ দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে তা বেশ বোঝা যায়। হয়তো সবক্ষেত্রে উতরে যেতে পারেনি।

বিশেষ করে ক্লোজ শটর্টগুলোতে যেভাবে একজন অভিনেতার এক্সপ্রেশন বা অভিব্যক্তি ফুটে উঠে সেখানে যদি অভিনয়টা তার ভেতর থেকে পুরোটা বের না হয় তখন তা কাঁচা কাঁচা মনে হয়। গল্পটাতে অনেকগুলো প্যাচ মেরে দেয়া হয়েছে ফলে গল্পটা পরিষ্কার হয়নি। একটু পর পর যেন বাধনহারা আর আগলা হয়ে যাচ্ছিল। দুইজন কথক গল্পটা বলে দিচ্ছিলো তারপরও যেন এর খাপছাড়া ভাবটা যায়নি। কিছু মিসিংলিংকও চোখে পড়ছিলো। জানি না এসব সেন্সরবোডের ২ বছরের হস্তক্ষেপের কারণে কাটছাট হয়েছে কিনা। টান টান উত্তেজনা তৈরীর চেষ্টা করা হয়েছে কিন্তু মনে হয়না সেটা করা গেছে। গল্পের গতি অনেক পরিশ্রমকে মাটি করে দিয়েছে। ভিনগ্রহের লোকদের সাখে যুদ্ধ যে পরিমাণ এ্যাকশন আশা করছেন সে পরিমাণ নয়।

আইটেম গান ছাড়া বাকী গানগুলো একই রকম। আমি জানি না যদি একই রকম গান দিতে হয় তাহলে সাইন্স ফিকশন মুভিতে ৪টা গানের কি দরকার? আর যদি গান দিতে হয় তাহলে সেগুলো একইরকম কেন হবে? কিন্তু মুল কারণ হলো কিছু শিক্ষিত লোক ছবিটির সাথে জড়িত তারা কিছু ভালো লাগার গান দিতে চেয়েছেন হয়তো। হয়তো একই কারণে নির্মাতারা ছবির প্রমোশনাল দিক দিয়ে বেশী ভাবেননি। আমার কাছে মনে হয় আরো বেশী প্রচারণার প্রয়োজন ছিলো। বিশেষ করে একটা গ্যাপ আমার কাছে মনে হলো। ছবিতে ভিনগ্রহ বাসী এক নেত্রী রয়েছে যে পৃথিবীতে মিশনটা পাঠায়। ছবির মূল ভিলেনও কিন্তু সে ভার্চুয়াল ক্যারেক্টারটি। তাদের নড়াচড়া রোবটিক হলেও আকৃতি বেশ সুন্দর। এনিমেটর এর প্রশংসা করতে হয়। পোষ্টারে সে কারেক্টারটির উপস্থিতি নেই। হোকনা অমনুষ্য কিন্তু গল্পতো তাকে একটা গুরুত্বপূর্ণ স্থান দিয়েছে। তাই তাকে পোস্টারে রাখা যেত। দর্শক আকর্ষনের জন্য সেটা ভালো হতো।

একটা জায়গায় আমি ব্যক্তিগতভাবে হতাশ হয়েছি সেটা হলো, আমরা ছবিতে বিভিন্ন দেশের কালচার দেখেছি, সত্যি বলতে কি অপেরা এবং রোড শো আমার কাছে ভিশন ভালো লেগেছে, ধন্যবাদ জানাতে চাই সেজন্য। এমনটি মুম্বাইতে ভারতীয় নায়িকা উর্বশীর আইটেম গানটাও উতরে গেছে সেখানে ব্যয়বহুলতার ছাপও রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশী কালচারের ছিটফোটাও কোথাও নেই। এমনকি বাংলাদেশী নারী পুরুষ বলে যাদের পরিচয় করে দেয়া হয়েছে তারাও পশ্চিমা পোষাকে ছিলো সারাক্ষণ। তারা হয়তো চরিত্রের প্রয়োজনে ছিলো। কিন্তু বাংলাদেশের যে প্রতিনিধিত্বশীল সংস্কৃতি সেটা একেবারেই অনুপস্থিত।

ছবির ক্যামেরার কাজ খারাপ হয়নি। আলো ও শব্দ কৌশলও ভালো ছিলো। সম্পাদনাও মানিয়ে গেছে। এনিমেশনরে কথা বলতে গেলে বাংলা সিনেমার কথা চিন্তা করে বললে বেশ ভালোই বলতে হবে। বিভিন্ন দেশে শুটিং করতে গিয়ে সম্ভবত শুটিং স্পট এর ক্ষেত্রে কেমন যেন ছদ্মপতন মনে হয়েছিলো। অন্যান্য বাংলাছবির মতো ঢাকা শহর বলতে কাওরান বাজার আর বসুন্ধরা সিটিকে দেখানো হয়েছিলো। এখানে নতুনত্ব থাকলে আরো ভালো লাগতো। আমি আবারো বলবো গল্পটি খুব ভালো ছিলো। সম্ভবত নির্মাতারা একটি সুন্দর মেসেজ দিতে চেয়েছিলেন যে, পৃথিবীবাসী তোমরা ঝগড়া বিবাদ করো না। যুদ্ধ বিগ্রহ করো না। নদীতে বাঁধ দিয়ে অন্যদের অধিকার বঞ্ছিত করো না। নিজেদের বিপদ নিজেরা ঢেকে এনো না। এই সুন্দর মেসেজটা দিতে গিয়ে গল্পের যে পরিণতি দেয়া হয়েছে সেটা বাংলা সিনেমার দর্শকেরা মেনে নিতে চাইবেনা। তারা এ ধরনের পরিণতিতে অভ্যস্ত নয়। হয়তো ছবিকে ভিন্নতা দেয়ার জন্যও এমনটা ভাবা হতে পারে।

অভিনয় করেছেন ইমন, রিথ মজুমদার , সব্যসাচী চক্রবর্তী, জুন মালিহা, উর্বশী রাউটেলা, সোহেল খান,  অপ্সরা আলী, চাষী আলম ও আরো অনেকে। পরিচালনা স্বপন আহমেদ প্রযোজনা খোরশেদ আলম। প্রযোজনাঃ রেগ এন্টারটেইনমেন্ট, ইমপ্রেস টেলিফিল্ম লিমিটেড। সব্যসাচী ও জুন মালিহাকে বাপ বেটি মনে হয়েছে শেষ দৃশ্যের আগে পর্যন্ত।

বাংলা ট্রিউবিন এর এক সাক্ষাৎকারে ছবির পরিচালক বলেন, আমরা যেখানে সেন্সরের জন্য দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষা করি সেখানে মাত্র দুই দিনে একটি ছবি (ওয়ান) কীভাবে রাতারাতি সেন্সর পায়? আমার মনে হয় আমাদের চলচ্চিত্রের জন্য বড় ধরনের ষড়যন্ত্র হচ্ছে। কারণ বিগত কয়েকটি ছবি দেখুন।   ‘কৃষ্ণপক্ষ’, ‘সত্তা’ ও ‘সুলতানা বিবিয়ানা’- প্রতিটি ছবির ক্ষেত্রে এমনটি হয়েছে। হঠাৎ কলকাতার ছবি চলে এসেছে এগুলোর মুক্তির সময়। আমার ক্ষেত্রেও তাই হলো। এতে করে অধিক হল দখল করে আমাদের দেশীয় ছবি পিছিয়ে দেওয়া হচ্ছে। যেন দেশের প্রযোজক-পরিচালকরা আস্তে আস্তে নিরুৎসাহিত হয়, ছবি বানানো বন্ধ করে দেয়। যেন এদেশের মানুষ বাধ্য হয়ে কলকাতার ছবি দেখে।  এদেশের টাকা যাবে কলকাতায়। শিল্পীরা সেখানে গিয়ে দু’একটি পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করবে। এটাই তাদের প্ল্যান।

তবে নির্মাতাদের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, নতুন কিছু করার চেষ্টাকে আপনি অবশ্যই সাধুবাদ জানাবেন। বাংলাদেশের মেইনস্ট্রিম সিনেমার শিল্পীদের অনুপস্থিতি আপনি ছবিতে ভালোভাবেই টের পাবেন। তবুও মানতেই হবে পরবাসিনী বাংলা চলচ্চিত্রে এক নবতর সংযোজন। যারা দেখতে চান তারা দেখে আসুন বাংলা সিনেমা হিসেবে বিদেশী ছবির দেখার চেয়ে পরবাসিনী দেখাই বেশী পজেটিভ বলে আমি মনে করি। এখানে নতুন অনেক কিছু আছে দেখার মতো। আর নতুন কিছু করতে গেলে প্রথমবার একটু লাইন বাঁকা হবেই। গতানুগতিক সোজা লাইনের কিছুর চেয়ে একটু আঁকা বাঁকা লাইনের নতুন কিছু দেখাই ভালো।

Published : মে ৫, ২০১৭ | 2300 Views

  • img1

  • Helpline

    +880 1709962798