জাগরণের পদযাত্রা থেকে অদম্য পদযাত্রা

Published : মার্চ ৩০, ২০১৭ | 1015 Views

জাগরণের পদযাত্রা থেকে অদম্য পদযাত্রা
জাহাঙ্গীর আলম শোভন

যুদ্ধ তখন পুরোদমে চলছে। পাকিস্তানী বাহিনীর চোখে হত্যা ও ধর্ষনের লালসা আর বাংলাদেশের মানুষের চোখে স্বাধীন হওয়ার স্বপ্ন। যুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন হলেই চলবেনা এজন্য প্রয়োজন হবে বিশ্বের স্বীকৃতি। বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্ব জনমত সৃষ্টি করার জন্য ১৪ অক্টোবর মুর্শিদাবাদ থেকে  যাত্রা শুরু করেন তারা ১৪০০ মাইল যাওয়ার জন্য। পথে থেমে তারা পথসভা করতেন, জনগণের সাথে কথা বলতেন। সাংবাদিকদের কাছে তুলে ধরতেন পাক বাহিনীর বর্বরতার কাহিনী। প্রথমে তারা ৩৪ জন ছিলেন। ১৯৭১ সালের ১৪ অক্টোবর মুর্শিদাবাদে  এসে যোগ দেন আরও ৪ জন। ১৫ অক্টোবর ১৯৭১ সালে ভারতের মুর্শিদাবাদে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় লংমার্চের কার্যক্রম।

দেশ স্বাধীন হলেও অর্থনৈতিক মুক্তি আসেনি। এমনি অনেক কিছুই আমরা অর্জন করতে পারিনি। তাই নতুন অর্জন এর জন্য তরুন প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করতে এই পদযাত্রা। ২০১৩ সাল থেকে অভিযাত্রী সংগঠনের কর্মীরা পায়ে হেঁটে শহীদমিনার থেকে স্মৃতিসৌধে যায় প্রতিটি ২৬ মার্চে। ২০১৪ সাল থেকে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও অভিযাত্রীর যৌথ আয়োজনে সাধারণের অংশগ্রহনের মাধ্যমে পালিত হয় ‘‘শোকে থেকে শক্তি- অদম্য পদযাত্রা নামে এই কর্মসূচী। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর নির্মানে হাঁটি একমাইল এই শ্লোগানে শতাধিক মানুষ অংশ নেয় এই পদযাতায়। চলতি বছর ২০১৭ সালে আমি নিজে এই পদযাত্রায় অংশগ্রহণ করি। সে স্মৃতি নিয়ে এই লেখা।

১৯৭১ সালে ৩৮ জন যুবক ভারতের মুর্শিদাবাদ থেকে পায়ে হেঁটে দিল্লী যাওয়ার জন্য প্রায় ১৪০০ কিলোমিটারের এক পদযাত্রা শুরু করেছিলো। লক্ষ্য ছিলো মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত তৈরী করা এবং স্বাধীন বাংলাদেশের আন্তজাতিক স্বীকৃতি আদায় করা। যদিও ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হওয়ার কারণে ১৭ ডিসেম্বর ভারতের উত্তর প্রদেশে তারা পদযাত্রা সমাপ্ত করেন।

গত বছর ২০১৬ সালে আমি যখন আমার পায়ে হেঁটে তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ ভ্রমণ শেষ করে ফিরছিলাম। তখন টেকনাফে দেখা হয় অভিযাত্রী ক্লাবের এক সদস্যের সাথে। তার মাধ্যমে পরিচিত হই ক্লাবের সভাপতি জাকারিয়া বেগ এর সাথে। তাই এই বছর অদম্য পদযাত্রায় যোগদানের সিদ্ধান্ত নেয়া খুব সহজ হয়েছে।

২৬ মার্চ সকালে উঠে চলে যাব শহীদমিনারে। ৬টায় যাওয়ার কথা থাকলেও আমার একটু দেরী হয়ে যায়। অভিযাত্রী দল শহীদ মিনার থেকে টিএসসিতে আসতেই দেখা হয়ে যায়। আমি সিএনজি থেকে নেমে তাদের সাথে যোগ দেই। তারপর শিখা চিরন্তন সেখানে কিছু সময় কাটিয়ে শাহবাগ কিন্তু এখানে পুলিশি বাঁধা অন্য কোনো সমস্যা নয়। প্রধানমন্ত্রী রাস্তা পার হবেন তাই তারা প্রায় ৩০ মিনিট আমাদের আটকিয়ে রাখলেন। সেখান থেকে সিটি কলেজ হয়ে মোহাম্মদপুর শারীরিক শিক্ষা কলেজ। এখানে ছিলো একাত্তর সালের পাক বাহিনীর নির্যাতন ক্যাম্প। এখানে দাঁড়িয়ে সেই দিনের কথা স্মরণ করে এবং জাগরনী গান গেয়ে সরাসরি চলে গেলাম রায়ের বাজার শহীদ বুদ্বিজীবি স্মৃতি সৌধ ও বধ্যভূমি। অভিযানে বেশীরভাগ তরুন হলেও। কয়েকজন মধ্যবয়স্ক ছিলেন। ছিলো কিছু স্কুল বালকও। বেশীরভাগ মানুষই ৩০ কিলোমিটার হাঁটলেন যারা অভ্যস্ত নন। তারা মাঝেমধ্যে রিকসায় বা গাড়িতে উঠেছেন। ভারতেশ্বরী হোমসের ছাত্রীরা একমাইল হেঁটেছিলো। সাথে ছিলেন এভারেস্ট জয়ী নিশাত মজুমদার। কিছুক্ষণ ছিলেন দুবার এভারেস্টজয়ী এম এ মুহিত। তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ পায়ে হেঁটে ভ্রমণকারী জাহাঙ্গীর আলম শোভন এবং পায়ে হেঁটে কলকাতা থেকে ঢাকা ভ্রমণকারী একজন অভিযাত্রী। শ্রদ্বেয় জাফর ইকবাল স্যার পদযাত্রায় অংশগ্রহণ করে অভিযাত্রীদের উৎসাহ দিয়েছেন। মিরপুর এসে কথা বলেছেন মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কামান্ডার আবু ওসমান।

আমার সাথে ছিলেন ক্যাঙারুজ ওয়াল্ডের সৌরভ আহমেদ জাকির ভাই। ঘাঁটে নৌকা আগে থেকেই ঠিক করা ছিলো ১৫০ জনের মতো লোক ৫টি নৌকায় উঠে গেলাম। সাথে ছিলো টহল পুলিশের একটি নৌকা এবং ফায়ার সার্ভিসের সাপোর্ট বোট।

প্রায় ঘন্টা দুয়েক নৌকাভ্রমণ শেষে গিয়ে উঠলাম সাভারের সাদুল্যাপুর। এর মধ্যে নৌকায় নাস্তা করা হলো হালকা ফল ফলাদিও দেয়া হলো উদ্যোক্তোদের পক্ষ থেকে। এর আগেই আমরা রেজিস্ট্রেশান করি এবং স্মারক টি শার্ট পরে নিই।

৫টি নৌকায় প্রতিটিতে কালো টি শার্ট পরা অভিযাত্রী দল আর তাদের হাতে লাল সবুজের পতাকা। নদীর বুক চিরে নৌকাগুলো চলছে। যেন এক অন্যরকম অভিযানে বের হয়েছি আমরা। বুকের ভেতর বাজছে দেশের গান। অন্যরকম পুলক নিয়ে গরমের মধ্যেও বেশ ভালো লাগছিলো সবার।

সাদুল্যাপুর নামার পর সে গোলাপ গ্রাম। এখানে অনেকে গোলাপ বাগানে নেমে ছবি তুললেন। এখানকার একটা স্কুলে রেস্ট নেয়ার ব্যবস্থা হলো। তখন প্রায় বারোটা বাজে। তারপর আবার হাঁটা। গ্রামের মেঠোপথ ধরে এগিয়ে চলেছে অভিযাত্রী দল। তারপর দুপুর ২টা নাগাদ আক্রান বাজারে। সেখানে অভিযাত্রীদের জন্য দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা হলো। হাত মুখ ধুরে দুপুরের খাবার খেয়ে অল্প একটু বিশ্রাম। তারপর আবার গ্রামের পথ ধরে চলা। বিকেল ৫টা নাগাদ আমরা জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌছলাম। এখানে কিছুক্ষণ বিশ্রাম তারপর আবার পথচলা।

আমরা যখন স্মৃতিসৌধে পৌছলাম। তখন চারদিকে অন্ধকার নেমে এসেছে। জনসাধারণের প্রবেশ নিষেধ থাকলেও আমাদের অনুমতি নেয়া ছিলো। তাই আমরা প্রবেশ করলাম। প্রায় ৪০ মিনিট এখানে থেকে আলোচনা ও শপথবাক্য পাঠ করে। আমরা ফিরতি গাড়ি ধরলাম।

১৫ অক্টোবর ১৯৭১ সালে ভারতের মুর্শিদাবাদ থেকে দিল্লীমূখী আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় লংমার্চের কার্যক্রম। স্বাধীনতা পেয়েছি। কিন্তু অর্থনৈতিক মুক্তির মতো অনেক কিছুই এখনো পাইনি। সেজন্য মুক্তিযুদ্ধের পরের প্রজন্মের আমরা যারা আছি। আমাদের দায় রয়েছে দেশের প্রতি। সে দায় থেকে এই পদযাত্রা। জাকারিয়া বেগ এর নেতৃত্বে আবারো শেষ হলো একটি সফল অভিযান।

আগামী বছরও অনুষ্ঠিত হবে এই পদযাত্রা। অংশগ্রহণকরবে অনেক মানুষ। আশা করি দেখা হবে সে চলার পথে।

Published : মার্চ ৩০, ২০১৭ | 1015 Views

  • img1

  • Helpline

    +880 1709962798