আমাদের বান্দরবান নাফাকুম ভ্রমণ

Published : জানুয়ারি ২৫, ২০১৭ | 2150 Views

আমাদের বান্দরবান নাফাকুম বা নাফাখুম ভ্রমণ

পুরো একডজন তরুনের দল নিয়ে আমরা চলেছি বান্দরবানের পথে। দিনটা ছিলো ১৯ জানুয়ারী। পরিকল্পনা হলো ২০ ও ২১ তারিখ ২ দিনের বান্দরবান সফর। বৃহস্প্রতিবার রাতে সন্ধ্যায় আটটায় গেলাম বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশানে। উদ্দেশ্য কমলাপুর গিয়ে শ্যামলী কাউন্টার থেকে বাসে উঠা। সাড়ে ১১ টায় বাসে উঠলেও প্রচন্ড জ্যামের কারণে রাত তিনটা বেজে যায় ঢাকা শহর ছেড়ে যেতে। যখন কুমিল্লায় হোটেল নূরজাহানে যাত্রাবিরতি করি তখন সকাল হয়ে গেছে। অথচ আমাদের ইচ্চা ছিলো সকাল নাগাদ বান্দরবান শহরে থাকা। কি আর করা। বান্দরবান পৌঁছতে বেজে গেলে দুপুর ১টা। চট্টগ্রাম শহরেও সেদিন কিছুটা জ্যাম ছিলো। প্রায় এক ঘন্টার বেশী সময় আটকে ছিলাম পটিয়ায়। ওদিকে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে চান্দের গাড়ি ভোর ৫টা থেকে। বাংলাদেশের অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ে ওয়ালেটমিক্স এর কর্মীরা যাচ্ছি বান্দরবান। সফর দেখভাল করছে চলবে ডট কম।

বান্দরবান নেমেই গাড়িতে উঠে বসতে হলো। থানছি যাওয়ার জন্য। বান্দরবান থেকে থানছি ৮০ কিলোমিটার। সময় লাগবে তিনঘন্টা। পাহাড়ী উচুনিচু রাস্তা। যেমনি ঢালু তেমনি আঁকা বাঁকা কোথাও ভাঙ্গাচোরাও আছে। ড্রাইভার রবিউল এমনভাবে গাড়ি চালাচ্ছে মনে হচ্ছে সত্যিই যেন চাঁদে যাচ্ছে রকেটে চড়ে। সবাই রীতিমত গাড়িতে সোজা হয়ে বসতে রাখতে হিমসিম খাচ্ছে। কিন্তু উপায় নেই। তিনটার মধ্যে বিজিবির চেকিং পয়েন্ট পার হতে হবে তা না হলে সামনে যাওয়ার অনুমতি মিলবেনা।

জিপ এগিয়ে চলেছে আর আমরা মুগ্ধ হয়ে দেখছি। প্রকৃতির রুপ। পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে জুম চাষ। সবুজ দিগন্তজোড়া গিরিখাতে মানুষের বসতি। পাহাড়ের কোলে ছোট ছোট ঘরগুলো যেন পাখির বাসা। দূর দিগন্তের পাহাড়গুলো আরামসে ঘুমিয়ে আছে পাহাড়ের পায়ে। যতদূর চোখ যায় শুধু পাহাড় আর পাহাড়।

জ্যামের ঠেলায় পড়ে দিনের অর্ধেক সময় নষ্ট হলো। তাই দেখা হলো না স্বর্ণমন্দির এমনকি নীলগিরি নীলাচল। তিনটি চেকিং পয়েন্ট পেরিয়ে আমরা যখন থানচি আসি তখন বিকেল চারটা। এখানে আগেই আমাদের জন্য দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। থানায় রিপোর্ট করে খাবার খেয়ে লম্বা নৌকায় উঠে পড়লাম। নৌকাপ্রতি চারজন করে। সাঙ্গু নদীর তির তির জলে নৌকা বেয়ে চললো মাঝি। কোথাও ভয়ানয়ক গভীর কোথাও হাঁটুপানি এটাই পাহাড়ী নদীর বৈশিষ্ঠ্য।

এরমধ্যে ছোটবড়ো নানা পাথরের বাঁক পেরিয়ে পাথর ঘেষে এগিয়ে চলল আমাদের নৌকাগুলো। দুপাশে উঁচু পাহাড়ের সারি। মাঝে মধ্যে মনে হয় যেন বাংলাদেশে নয়। অন্যকোনো দেশে এসেছি। মোটরের শব্দ ভেদ করে মাঝে মধ্যে কানে বাজছে নানাপ্রজাতির পাখির ডাক। তিন্দু পৌছতে সন্ধ্যা হয়ে গেলেো। ৫টায় নৌকায় উঠে ৮টা বেজে গেলো রেমাক্রি পৌছতে। সেখানে নীলা গেষ্টহাউসে আমাদের থাকার ব্যবস্থা ছিলো। রেমাক্রির ছোট্ট একটি বাজারে রয়েছে কিছু দোকান। এখানে আমাদের খাবারের ব্যবস্থা হয়েছে মার্টিন পরিবারের সাথে আর সাঙ্গু নদীর পারে রয়েছে যুবরাজের সঙ্গীতসন্ধ্যা ও বারবি কিউ। সব কাজ ঠিকমতো হলো। বাজার থেকে লুঙ্গি ও জুতা কিনলো অনেকে। কয়েকজনের ফোনে চার্জ দেয়ার ব্যবস্থা হলো। বান্দরবানে রবি ও জিপি নেটওয়া্র্ক আছে। থানছিতে আছে রবি আর টেলিটক। আর রেমাক্রিতে শুধু টেলিটক। অবশ্য গহীন অরন্যে কোনো নেটওয়ার্কই আপনি আশা করতে পারেন না। কেউ বান্দরবান ভ্রমনে গেলে বিষয়টি অবশ্যই মাথায় রাখবেন। আমাদের কাছে টেলিটক ছিলো না। তাই আমরা থানছিতে প্রত্যেকের পরিবারকে ফোন করে বলে দিয়েছি যে ২ দিন আমরা নেটওয়ার্ক এর বাইরে থাকবো।

সন্ধ্যায় একটু রেস্ট নিয়ে আমরা চলে আসলাম নদীর কুলে। মাঝখানে আগুন জ্বালিয়ে গোল হয়ে বসে গিটার বাজিয়ে একটার পর একটা গান ধরলো শিল্পী যুবরাজ। ‍ততক্ষনে আমাদের শরীরও উষ্ণতা পেলো। অবশ্য এজন্য লাড়কি কিনতে হয়েছে। যদিও পাহাড়ীদের অনেক লাড়কি আশপাশে ছিলো যেগুলো শুকাতে দেয়া হয়েছে। আমরা কিনেই জ্বালিয়েছি। কারণ ওদের রান্নার জ্বালানী ব্যবহারের কোনো অধিকার আমাদের নেই। গান যখন শেষ হলো তখন এলো বারবিকিউ। চমৎকার হলো। সবাই খুশি এবং একবাক্যে প্রশংসা করলো। তবে মার্টিন পরিবারের সাথে রাতের খাবারের কথা কোনোদিন ভোলার নয়। একটা বড়ো ধরনের মোরগ জবাই হলো। সাথে ডাল আর চালকুমড়া। সবকিছুই অসাধারণ। মোরগটা আমরা জবাই করলাম। ওরা যেহেতু খ্রিষ্টান। সেজন্য ওদের হাতে জবাই ওরা করেনা। কারণ কেউ যদি না খায়। মার্টিন এর পরিবারের মুলত বম উপজাতির বাসিন্দা। পরে ওরা খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করে। মার্টিন এর এক ছেলে এবং এক মেয়ে থাকে ঢাকায়। তারা মিডিয়াতে কাজ করে।

রাতে বেড়ার ঘরে হালকা কম্বল গায়ে দিয়ে ঘুমুতে গেলাম। ভয়ছিলো খুব বেশী শীত পড়ে কিনা। শীতযে একেবারে কম পড়েছে তা নয়। তবে সবাই শীতের কাপড় পরে ঘুমানোতে সেটা সামাল দেয়া গেছে।

কথাছিলো ভোর ৫টায় উঠে নাস্তা করে ৬ টায় রওনা দেব নাফাকুম এর উদ্দেশ্যে। ‍একঘন্টা দেরী হয়ে গেলো। নদীর ঠান্ডা জল। পাহাড়ের উচুনিচু পায়ে হাঁটা পাথুরে পথ ধরে তিনঘন্টা হেঁটে আমরা গেলাম। নাফাকুম। যেখানে সবকিছুই সুন্দর সেখানে আলাদা করে কোনো কিছুকে সুন্দর বলি কি করে। নিরব প্রকৃতির মাঝদিয়ে গাছ গাছালির ফাঁকদিয়ে হালকা কুয়াশার আবরণ ভেদ করে পড়ছে সূর্যের আলো। তার ফাঁক দিয়ে এগিয়ে চলেছি আমরা। পথে অবশ্য চা খেয়ে নিলাম পাহাড়ীদের দোকানে।

নাফাকুম এর মূল ঝর্ণায় যাওয়ার অনুমতি নেই। কিছুদিন আগে চার পর্যটক অপহরণ হওয়ার ঘটনায় একটু সর্তকতা বেড়েছে। তাই তার ৫ কিলোমিটার আগেই একটা ঝর্ণায় আমাদের দর্শনপবর্ব, সেলফি আর ছবিতোলা শেষ করতে হলো। তাছাড়া মায়ানমান সীমান্তের কাছে গভীর জঙ্গলে ঝর্ণার উৎসমুখে যাওয়ার জন্য আরো হাঁতে হবে কমপক্ষে দেড়ঘন্টা আর সময়ের স্বল্পতা রয়েছে। আমাদেরকে আজই ফিরতে হবে। সাধারণত ২ দিনের সফরে বান্দরবান যাওয়া বোকামী। ৩ থেকে ৫দিন হলে ভালো।

পাথরের গা ঘেষে সড়সড় শব্দ করে বয়ে চলেছে ঝর্ণায় জল। শতসহস্রধারায় এই পানি কতশত বছর ধরে বয়ে চলেছে কেউ জানে না। পাথরের গা ক্ষয় হয়ে এখানে তৈরী হয়েছে যেন সব শৈল্পিক ‍ভাস্কর্য।  কিছু করার নেই ফিরতে হলো। কিন্তু চোখে লেগে রইলো নাফাকুম এর অপূর্ব রুপ। আর কানে বাজছে ঝর্ণার ছলছল শব্দ। গভীর রাতে ঘুমের মাঝেও যেমন শুনেছিলাম নদীর ছল ছল শব্দ। এখনো তেমনি কান পাতলে শুনতে পাই সেই শব্দ। রেমাক্রিতে ফিরে দুপুরের খাবারের পর আবার সাঙ্গু নদী ধরে পথচলা। দুপাশে পাহাড়ীদের ছোট ছোট ঘর। যেন ছোট ছোট স্বপ্ন। স্বপ্ন দেখার কি সুন্দর প্রয়াস। পাহাড়ের ঢালে ঢালে জুমচাষীদের ‍নানাফষলের সমাহার। পাহাড়ী রমনীদের গোসল, মাছধরা কিংবা শামুকতোলা সবকিছুই চোখে পড়বে। এযেন বাস্তব নয়। শিল্পীর কল্পনা কিংবা পটে আঁকা কোনো ছবি।

-জাহাঙ্গীর আলম শোভন

Published : জানুয়ারি ২৫, ২০১৭ | 2150 Views

  • img1

  • Helpline

    +880 1709962798