ট্যুরিস্ট স্পট এর পরিবেশ প্রসঙ্গ

Published : জানুয়ারি ২৪, ২০১৭ | 1782 Views

ট্যুরিস্ট স্পট এরপরিবেশ প্রসঙ্গ

জাহাঙ্গীর আলম শোভন

এক
আমার কাছে আরেকটা জিনিস খারাপ লেগেছে। যারা কক্সবাজার গিয়েছেন তাদের হয়তো চোখে পড়েছে যে পথের ধারে বনের উপকূলে রয়েছে ক’টা রেস্টুরেন্ট। এটা খারাপ লাগার বিষয় নয়। খারাপ লাগার বিষয় হলো রেস্টুরেন্ট গুলোর ময়লা ফেলা সেটা আবার রাস্তার ধার ধরে। প্লাস্টিকবর্জ বনকে দিনে দিনে কোনঠাসা করে ফেলছে। সরকার একবার প্লাস্টিক পলিব্যাগ বন্ধ করতে চেয়েছিলো। তারজন্য যে কৌশলগুলো ছিলো সেগুলো বাজার ঘুরে খুঁজে দেখা। কিন্তু কয়দিন আবার যে লাউ সেই কদু। এব্যাপারে আমার কিছু পরার্শ ছিলো সেগুলো আমি পরিবেশ মন্ত্রনালয়ের মাসিক সভায় একবার বলেছিলাম।

দুই:

কুমিল্লা ময়নামতি বিহারে সারাদিন নানা ময়লা ফেলছে পর্যটকরা। ডাস্টবিন থাকলেও সাধারণ মানুষের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। একজন বললাম ভাই কেন ময়লা করছেন। এটাতো ময়লা করা আমাদের দায়িত্ব নয়। পরিষ্কার করা আমাদের দায়িত্ব। তিনি বললেন, সমস্যা নেই। প্রতিদিন এটা পরিষ্কার করা হয়।

অদ্ভুৎ দেশ, পরিষ্কার করা হয় সেজন্য ময়লা করতে হবে। আমি প্রতিদিন গোসল করি। সেজন্যকি গায়ে ময়লা লাগতে হবে? পরে আমি এবং ছোটরভাই বেশ কিছুক্ষণ সময়নিয়ে আনন্দবিহারকে পরিষ্কার করে ফেলি।বলছিলাম সেই সময়ের কথা। যখন দেখবো বাংলাদেশ গড়বো বাংলাদেশ স্লোগান নিয়ে পায়ে হেঁটে তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ ভ্রমণ করছিলাম।

তিন

যখন সীতাকুন্ড ইকোপার্কের ভেতরে প্রবেশ করেছিলাম। ভেতরে ডুকে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। মনে হলো ময়লার ভাগাড় হয়ে আছে ভেতরে। প্লাস্টিক বোতল, চিপসের প্যাকেট ইত্যাদি প্লাস্টিক বজ্য প্রাকৃতিক পরিবেশকে নষ্ট করে তুলছে। এবং জীব বৈচিত্রের জন্য এটা মারাত্বক হুমকি।

সেন্টমার্টিন সমুদ্র সৈকতে মৃত ক্যাটফিষ

সেন্টমার্টিন সমুদ্র সৈকতে মৃত ক্যাটফিষ

চার:

সবচেয়ে মারাত্মক পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে প্রবাল দ্বীপ সেইন্টমার্টিনে। ৫ বর্গকিলোমিটারের দ্বীপে মৌসুমে দৈনিক ২০০০ পর্যটক যাচ্ছেন। তাদের ব্যবহুত পানির বোতল থেকে শুরু করে সব কিছুর উচ্ছিষ্ট জমা হচ্ছে দ্বীপে। অন্যদিকে হোটেল ও রিসোর্টগুলো থেকে ফেলা হচ্ছে নানা ময়লা। আমি গত ২০১৬ সালের ডিসেম্বর যখন ২য়বার সেন্টমার্টিন যাই। এই বিষয়ে কথা বলি সেখানকার নেয়ারম্যান এর সাথে। তারাও চায় এটা বন্ধ হোক। কিন্তু এজন্য কি করতে হবে তা তারা জানেন না। বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। কিন্তু সেখানকার লোকজন সচেতন নয় বিধায় তারা সরকারের উদ্যোগের দিকে চেয়ে বসে থাকে। ফলে কাজের কাজ কিছুই হচ্ছেনা। এখনি একটা কিছু না করলে পুরো দ্বীপ একটা ডাস্টবিনে পরিণত হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র।

পাঁচ

নদীপথে অবস্থা আরো খারাপ। পথে পথে পানির বোতল, ড্রিংসের বোতল আর প্লাস্টিকের প্যাকেট ফেলছেন অনবরত। যাত্রীদের অসচেতনতা, লঞ্চমালিকদের উদাসীনতা, আইনের দূর্বলতা, প্রয়োগহীনতা, প্রশাসনের নির্লিপ্ততা, পরিবেশ সংগঠনগুলোর নিষ্ক্রিয়তার কারণে এসব দিন দিন বেড়েই চলেছে। অথচ অপচনশীল এসব ময়লা নদীর তলায় জমা হয়ে নদীর নাব্যতা নষ্ট করছে আর নষ্ট করছে পরিবেশ। এসবরে কারণে মাটি ও পানি তাদের স্বাভাবিক গুনাগন হারাচ্ছে আর ধ্বংস হচ্ছে ইকোসিস্টেম। সময় থাকতে পদক্ষেপ না নিলে  এসবের জন্য জাতিকে চরম মূল্য দিতে হবে।

প্রথম কথা হচ্ছে এটা আসলে বন্ধ করা দুরুহ। তবে আমরা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কিছু আইনি বা প্রটেকশানমূলক পদক্ষেপ নিতে পারি। যেমন-
১. নিন্মমানের প্লাস্টিক, পাতলা প্লাস্টিক, খাবার প্যাকিং প্লাস্টিক নিষিদ্ধ করা।
২. প্লাস্টিক মোড়কিকরণ নিয়ন্ত্রণ করা। মানে যেসব পন্য মোড়কি করনের জন্য প্লাস্টিক মোড়ক জরুরী নয় সেগুলোর জন্য প্লাস্টিক মোড়ক নিষিদ্ভ করা। অন্যযেগুলোর জন্য প্রযোজ্য সেগুলোর জন্য জেলা পরিবেশ দপ্তর থেকে নিবন্ধন এর ব্যবস্থা করা। অর্থাত প্লাস্টিক কভার ব্যবহার করতে হলো সরকারে রেজিস্ট্রেশন বা অনুমোদন লাগবে। বিএসটিআই এর সিল এর মতো একটি অনুমোদন সিল ও নাম্বার থাকবে। সেটা পন্যের গায়ে দর্শনীয় হবে। প্রয়োজনে যেকোনো নাগরিক ওই নাম্বারটি দিয়ে এসএমএস পাঠিয়ে যাচাই করতে পারবে। এটা সঠিক কিনা।
৩. যেসব পন্যের প্লাস্টিক বিকল্প আছে সেগুলোর ভ্যাট ও টেক্স বৃদ্ধি করা।
৪. প্লাস্টিক মোড়কের সাথে সিগারেট এর প্যাকেটরে ন্যায় এনবিআর এর টিকেট লাগানো যাতে কেই ৫০০ মোড়কের নামে ৫ হাজার মোড়ক বানাতে না পারে।
৫. প্লাস্টিক বর্জ বা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর ময়লা কম হয় এমন শিল্পকে সুবিধা দেয়া
৬. যেসব উপজেলায়, থানায়, ইউনিয়নে প্লিাস্টিক পন্য কম ব্যবহার হয় সেগুলোকে পুরষ্কৃত করা।
৭. প্লাস্টিকের বিকল্প শিল্পগুলোকে সুবিধা প্রদান করা।

৮. বিশেষ করে টুরিস্টস্পটগুলোতে প্রবেশ ফিস এর সাথে আলাদা পরিবেশ ফি যোগ করে সে ফি দিয়ে এখানকার পরিছন্নতার কাজে ব্যয় করা উচিত। প্রয়োজনে আলাদা পরিছ্ছন্নতা কর্মী নিয়োগ করা যেতে পারে।

৯. ব্যাপক লোকসমাগম হয় এলাকায় স্থাণীয় আদালত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মেজিস্ট্রেট ও পুলিশের মাধ্যমে আইনের প্রয়োগ করে অপরাধীদের শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। প্রতিটি স্পটে সাইনবোর্ড লাগিয়ে সচেতনতামূলক লেখা দিতে হবে। এতে পরিবেশের ক্ষতি ও আইনগত শাস্তির কথা উল্লেখ করতে হবে।

১০. কমুনিটি ট্যুুরিজম এর মাধ্যমে স্থানীয় জনগোষ্ঠেকে সম্পৃক্ত করে এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করলে সফল হওয়ার সম্ভাবনা বেশী রয়েছে।

Published : জানুয়ারি ২৪, ২০১৭ | 1782 Views

  • img1

  • Helpline

    +880 1709962798