সুন্দরবন ও বাঘেরহাট ভ্রমণের স্মৃতি

Published : জানুয়ারি ৯, ২০১৭ | 1193 Views

সুন্দরবন ভ্রমণ

সুন্দরবন  ও বাঘেরহাট ভ্রমণের স্মৃতি

জাহাঙ্গীর আলম শোভন

 

আমরা ৬ জন যাত্রা শুরু করেছি বাগেরহাট হাটের উদ্দেশ্যে। প্রথমে বাগেরহাট শহুরে নেমে ষাট গম্বুজ মসজিদ, খান জাহানআলীর মাজার ও শহরতলীর নিকটে একটি পার্ক ভ্রমণ করি। প্রথমদিনের সূচী অনুযায়ী। ষাটগম্বুজ মসজিদের পাশেই দৃষ্টিনন্দন এক গম্ভুজ মসজিদ। তার পাশে অনতিদূরে খানজাহান আলীর বসতি ভিটার চিহ্ন ও দিঘী রয়েছে। এসব দেখতে দেখতে একবেলা চলে গেলো। আরেক বেলায় ‍খানজাহান আলীর মাঝারে গিয়েছিলাম। মাঝারের পাশে দিঘী আর দিঘীতে থাকা কুমীর এখানকার পর্যটন আকর্ষণ।

২০১২ সালের প্রথম প্রহর শুরু হয় বাঘের হাট থেকে। আগে থেকে আমাদের প্লান করা ছিলো যে বাগেরহাট ষাট গম্ভুজ মসজিদ আর সুন্দরবন ভ্রমণ একসাথে হবে। যেই কথা সেই কাজ। নতুন বছরেই শুরু হলো ভ্রমণ।

সরাসরি কুমীর দেখা হয়নি। তবে আমি দিঘীতে নেমে শাপলা তুলেছিলাম। কাজটা কঠিন ছিলো। এরকম একটি কাজের জন্য সর্তক ও সাহস দুটোই থাকতে হয়। শুধু সতর্ক থাকলে হয়না। আবার শুধু সাহস থাকলে হয়না। ঝুঁকি একটু ছিলো। কিন্ত শাপলা ঝোপের মধ্যে দিয়ে কমীর কাছে আসলে একটু বোঝা যাবে। আর দিনের বেলায় নাক ভাসিয়ে কুমীর যদি আপনার কাছাকাছি আসে সেটা না বোঝার জন্য যতটুকু বোকা হওয়া দরকার ততটা বোকা যদি আপনি হন তাহলে আপনার এধরনের জলাশয়ে নামার দরকার নেই।

খানজাহান আলীর মাঝারের ভাবগাম্বীর্য যথেষ্ঠ ভালো। এখানে মোমবাতি ছাড়া অহেতুক কোনো বাজে ব্যাপার চোখে পড়েনি। অন্যরা যাই করুক আমরা কেবল মাঝার জেয়ারত করে কিছু ছবি তুলে ফিরে এলাম। অবশ্য দুপুরের খাবার এখানে খেয়েছিলাম। আর কিছু গিফট কিনেছিলাম। ট্যুরিজম স্পটগুলোতে স্যুভেনির পন্যের পসরা থাকে। সুভ্যেনির মানে হলো স্থানীয় উৎপাদিত বা তৈরীকৃত পন্য যা ওই এলাকার পরিচয় বহন করে। কিন্তু দু:খের বিষয় আমাদের দেশে ট্যুরিজম স্পটগুলোতে চায়না পন্যের বিস্তর সমাহার। বার্মিজ পন্যের বিক্রয়ও দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু আমাদের দেশে প্রতিটি গ্রামে কিছুনা কিছু পন্য রয়েছে। রয়েছে হাতের কাজ, আরো আছে নানা রকমের পিঠা। সেগুলো হতে পারে আমাদের সুভ্যেনির পন্য। ‍এ বিষয়রে ট্যুরিস্টদের সচেতন হতে হবে অবশ্যই যেখানে বেড়াতে যাবেন সেখানকার পন্য কেনার চেষ্টা করবেন। চায়না পন্য নিতান্ত যদি আপনার প্রয়োজন হয় সেটাতো ঢাকা শহরে কম নেই।

আর স্থানীয় প্রশাসনের উচিত লোকাল মানুষদের পন্যকে প্রমোট করার এবং বিক্রি করার জন্য প্রতিটি ট্যুরিজম স্পটে সুভেনির শপ এবং সুভ্যেনির মার্কেট বসানো। যাতে বিদেশী পন্যের পরিবর্তে দেশীয় ও স্থানীয় পন্য বিক্রির ব্যবস্থা করতে হবে। ভ্যাট ও ট্যাক্স মওকুপ করে ডিউটি ফ্রি শপ হিসেবে এর দামও যেন পর্যটকদের হাতের নাগালে থাকে সেটাও বিবেচনায় রাখতে হবে। কারণ সুভ্যেনির প্রোডাক্টস ক্রয় বিক্রয় ট্যুরিজমের একটা অংশ।

ষাটগম্ভুজ মসজিদের গম্ভুজ আসলে ৮১টি। দৃষ্টিনন্দন এই মসজিদটি বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। আমার কাছে ভালো লেগেছে যে পার্কটি নতুন করে তৈরী হচ্ছিলো সেটাতে। পার্কটিতে নিচু জায়গায় সুন্দরী গাছ রয়েছে। আছে মৎসকন্যা ও পুকুর। ডাইনোসর সুপার ম্যান বাগ হরিণ অজগরের মূর্তি। আমার কাছে সবসময় ন্যাচারল বিষয়গুলোই ভালো লাগে। তবে এখানে ১২ রাশির প্রতিকগুলোর রয়েছে। আপনার মন চাইবে আপনি যদি মকর রাশির জাতক জাতিকা হোন তাহলে মকরের সামনে নিশ্চই ছবি তুলবেন। রং এর কাজগুলো খুব সুন্দর ছিলো যতদূর মনে পড়ে।

বাগেরহাটের একটি বাড়িতেই সেদিন রাতে আমরা বেড়ালাম। বিকেলে অবশ্য নদীর পাড়ে ঘুরতে গিয়েছিলাম। নদীর এপারে বাগেরহাট ওপারে বরিশাল। বাঁধানো ঘাট ধরে হেঁটেছি অনেকদূর। নৌকাও উঠে ধরেছি গানের সূর। নানা দুস্টুমি  আর মজা করে রাতে শাওনের বাড়িতে এলাম। শাওন সে ছেলেটি যার বাড়িতে রাতে থাকা হয়েছিলো।

সকালে খেজুরের রস এর পায়েস খেলাম মন ভরে তারপর পথ চললাম সুন্দরবনের দিকে। বনবিভাগের চৌকি পেরিয়ে সুন্দর বনের প্রবেশ পথে আমাদের যতই সাবধান করা হলো বাঘের ভয় দেখিয়ে বস্তুত বনে ঢুকে আমরা হতাশই হয়েছিলাম। কারণ এখানকার বন আসলে বনই নয়। হয়তো এই এলাকা দিয়ে বন শুরু হয়েছে বলে অথবা বনখেকোদের পেটে চলে গিয়েছে এখানকার বনের গাছপালা। বড়ো কোনো গাছ চোখে পড়লোনা। সব ঝোপঝাড়। সামেন এগুলোতো হতাশ হতে হবে মনে হলো। ‍বাঘের ভয়তো দূরে থাক। বনের মধ্যেযে বনের ভয় মানে গা ছম ছম একটা ব্যাপার থাকে সেটাই পেলামনা। পরে সিদ্ধান্ত নিলাম বন বাগের হাট সাইড দিয়ে না দেখে খুলনা দিয়েই দেখাই ভালো। নব্বই ডিগ্রিতে পথ ঘুরিয়ে নিলাম ঘন্টাখানেক হাঁটার পর একটি খাল পেলাম সেটি ধরে রাস্তায় উঠে এলাম। তারপরই সেখান থেকে গাঁযের পথ ধরে চলে এলাম ‍বাগের হাঁটের একপ্রান্ত। যেখানে নদীর ওপারেই মংলা বন্দর।

নৌকা নিয়ে গিয়েছিলাম করমজল পয়েন্টে। সেখানে একটি কুমীর প্রজননকেন্দ্র রয়েছে। কমীরের বাচ্চাগুলো সেখানে ‍পিলপিল করে ঘুরছে ছোট চৌবাচ্চার মধ্যে। ভাবতে অবাক লাগবে ছয়ইঞ্চির এই ছোট প্রাণীটি একবছরে একটা আস্ত কমীরে পরিণত হয়ে ঘাড় মটকে দিতে পারে যেকোনো ডাঙ্গার প্রানীর। এখানে প্রচুর বানরের উৎপাত। ‍খাবারের জন্য সামনে চলে আসে। সঠিক আচরণ করতে না পারলে ‍ওরা ‍আক্রমণ করে বসতে পারে। ‍করমজল ছোট একটা দ্বীপের মতো। মানচিত্র কিংবা গুগলম্যাপ যেখানেই দেখেন দেখবেন যে ছোট ছোট অসংখ্য খাল দিয়ে গোটা সুন্দরবন ‍জালের মতো। ছোট ছোট ভূখন্ডগুলো দ্বীপের মতো। করমজলও যেন একটি দ্বীপ। এখানে জোয়াভাটা হয় বিধায় প্রচুর কাঁদা থাকে। তবে ট্যুরিস্টদের জন্য কিছু থে কাঠের পুল বা সাঁকো বানানো রয়েছে। এখানে নেহায়েত ঘুরবাজ লোকজনের আড্ডা রয়েছে। তা না হলে একটু ভয়ই পেতে হবে। মোটামোটি জঙ্গল। কোথাও কোথাও বেশ ঘণ। হরিণের পায়ের ছাপ প্রতিইঞ্চিতে রয়েছে। ‍গাছের ফাঁকে ফাঁকে ছোট ছোট লাল কাঁকড়াদের দৌড়াদৌড়ি। পাখির ডাক, গাছের ছায়া, সমুদ্রের জোয়ার ভাটার খেলা, ম্যানগ্রোভ গাছের শেকড়, গোলপাতা আর নানা অজানা গাছের ভীড়। সেযাত্রায় সুন্দরবনের কেবল এটুকু রুপই দেখতে পেয়েছিলাম। সন্ধ্যা অবধি থাকলে হরিণের দেখা মিলতো। লোকেরা যতই বাঘের ভয় দেখাক। আমার ধারণা এত কাছের বরে বাঘমামা আসতে চাইবেনা।

সেদিনই সন্ধ্যায় খুলনা হয়ে ট্রেনে ঢাকায় ফিরে এলাম। সুন্দরবনের গভীরে যাওয়া পরবর্তী পরিকল্পনাই থাকলো এই সফরের প্রতিপাদ্য। আশা করছি চলতি বছর ২০১৭ তে সে ইচ্ছা পূরণ হবে।

বি:দ্র: ফিচার ইমেজের প্রথম ছবিটি বাগের হাটের দ্বিতীয় ছবিটি কোলাজ ও এডিট করা। এখানে যে হারিণটা হাতের কাছে রয়েছে সেটা আসলে কাঠের হরিণ। বনের হরিণ মানুষের এত কাছে আসেনা। মজা করার জন্য ছবিটি তৈরী করা হয়েছে।

Published : জানুয়ারি ৯, ২০১৭ | 1193 Views

  • img1

  • Helpline

    +880 1709962798