মারাঠি মুভি সাইরাত সাড়া ফেলেছে ভারতে

Published : জানুয়ারি ৪, ২০১৭ | 3735 Views

মুভি রিভিউ: সাইরাত

জাহাঙ্গীর আলম শোভন

sairat

ওদেরকে দেখে হয়তো আপনার মনেই হবেনা যে ওরা কোনো সিনেমার নায়ক নায়িকা। কিন্তু ২০ বছরের আকাশ থোসার আর ১৬ বছরের রিঙ্কু রাজগুরু এখন আলোচেনায়। তাদের নিয়ে চায়ের কাপে ঝড়, কমেডি শোতে দাওয়াত, লাইভ শোতে সাক্ষাৎকার, আর রিয়েলেটি শোতে আওয়াজ। রিমেক হচ্ছে অন্য রাজ্যে। নায়ক নায়িকারা রাতারাতি তারকা বনে গেছে। তাদের নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহ এখন তুঙ্গে। ছবির শ্যুটিং স্পট, নায়ক নায়িকার বাড়ী, তাদের পড়া স্কুল কলেজ সব জায়গা হয়ে গেছে মারাঠিদের সেলফি পয়েন্ট। এসব স্থানে প্রতিদিন শত শত মানুষ ভিড় করছে। ছবির পাত্র-পাত্রীদের গ্রাম, গ্রাম বাসী এমনকি আত্মীয় স্বজনের কদর এখন সর্বত্র। ভারতের প্রায় সব শো এবং চ্যালেন তাদের ডাকে। ভারতের বাইরে শপিং সেন্টারে গিয়েও ভক্তদের ভিড় এড়াতে পারছেনা মাত্র কিছুদিন আগেও সাধারণ থাকা দুই তরুন তরুনী। কি করে হলো এতসব এবার শুনুন সে গল্প।

গত বছরের ২৯ এপ্রিল  মুক্তি তাদের ছবি স্যাইরাত বা সাইরাত এখন সমগ্র ভারতজুড়ে আলোচনার বিষয়। সাইরাতের প্রশংসা করেছেন খোদ আমিরখান।  মারাঠি ভাষায় নির্মিত রোমান্টিক রোমান্টিক  ছবি। নাগরাজ মানজুলে পরিচালিত সাইরাতের  চরিত্রগুলোও দর্শকের মনে কেমন দাগ কেটেছে তা নিশ্চয় বলে বুঝতে পেরেছেন।  অথচ ছবিতে নেই মার মার কাট কাট  এ্যাকশন, নেই আইটেম গান, নেই মোছওয়ালা ভিলেন, নেই হ্যাংলা ভাড় এমকি নাচগানেও ছিলনা কোনো বাড়তি আয়োজন। গ্রামের ২ কিশোর কিশোরীর প্রেমকে তুলে ধরা হয়েছে তাতে কোনো রং মাখানো হয়নি। প্রেমের জন্য দুজনকে প্রচুর মার খেতে হয়েছে। দৃশ্যগুলো এতটাই ন্যাচারাল মনে হয় সত্যি সত্যি, এমনকি ক্যামেরা জার্ক করছে তবুও দর্শকের ভালো লেগেছে সেসব এটাই আসল কথা। যতক্ষন দর্শকের চোখ সিনেমার পর্দার উপর আটকে ছিলো ততক্ষন দর্শক বিশ্বাস করেছে যা দেখছে তা সব সত্যি। এবং গল্পের পরিণতি কি হবে শেষ হওয়ার ৫ মিনিট আগে যদি কাউকে ১০ টি অপশন ভাবতে বলা হয়। কেউ আন্দাজ করতে পারবে কিনা এ ব্যাপারে আমি অন্তত সন্দিহান।

ছবিটি মারাঠি ছায়াছবির ইতিহাসে সর্বোচ্চ আয়ের রেকর্ড ভেঙে ফেলেছে। ছবির নায়িকা রিংকু রাজগুরু জিজামাতা কন্যা প্রশালা বিদ্যালয়ে ১০ম শ্রেনীতে পড়ছে। এবছর সে ১১ ক্লাসে উঠছে। আর আকাশ থোসারকে যে সদ্য গ্র্যাজুয়েট। ছবিতে অসম্ভব ক্রিকেট পাগল একটা ছেলে এবং পুলিশে যোগ দেওয়ার কথা ভাবছে, খুব সাদাসিধে একটা ছেলে। কাউকে একটা চড় মারার ক্ষমতাও তার নেই। সাইরাত নিয়ে আলোচনা এমন পর্যায়ে গিয়েছে সাইরাতের শুটিং স্পটগুলো ট্যুরিস্ট স্পটে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন এসব জায়গায় শত শত মানুষ সেলফি তোলার জন্য ভিড় করছে। এমনকি বস্তিটাও বাদ পড়ছেনা।

Sairat ছবির গল্পও দুটো কিশোর কিশোরীর প্রেমের গল্প। প্রথম মনে হবে এরকম প্রেমের গল্প সব গ্রামেই ২/১টি আছে। কিন্তু আস্তে ভালো লাগতে শুরু করবে। গ্রামের বিত্তবান পরিবারের মেয়ে প্রেমে পড়ে  জেলের সন্তানের। আসে বাঁধা আর নির্যাতন সে বাঁধা পেরিয়ে তারা নিজের গ্রাম ছেড়ে চলে যায় অভিভাবকদের হাতের নাগালের বাইরে। গ্রাম ছাড়া হয় পার্শা (আকাশ) এর পরিবার। প্রচন্ড নির্যাতন এর শিকার হয় আকাশের ২ বন্ধু যারা তাদেরকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করে।

এক পর্যায়ে ধরা পড়ে যায় প্রেমিক যুগল। তারপর থানা পুলিশ সেখান থেকে অসীম সাগসী প্রেমিকা রিঙকু রুপী আর্চি বা আর্চনা হাতে পিস্তল নিয়ে প্রেমিককে উদ্বার করে পাড়ি দেয় অজানার পথে। সারাজীবন দেখেছেন গুন্ডাদের হাত থেকে নায়িকা উদ্ধার করে নায়ক তার ইজ্জত বাঁচায় তারপর প্রেম। এখানে ঠিক তার উল্টো। কিন্তু আপনার ভালো লাগবে ব্যাপারগুলো, কারণ লোকেদের ভালো লেগে গেছে বৈ কি?

নি:স্ব দুই তরুন তরুনী পথে পথে নানা বিড়ম্বনা পেরিয়ে তেলেগুর এক বস্তিতে আশ্রয় পায়। এখানে কারখানায় কাজ নিয়ে তারা গড়ে তোলে তাদের সুখের সংসার। বিয়ে হয় তাদের ঘরজুড়ে আসে ফুটে ফুটে একটি মেয়ে শিশু। আর্চনা গোপনে মোবাইলে যোগাযোগ রাখে মায়ের সাথে। এই যোগাযোগই তাদের কাল হয়ে দাঁড়ায়। এটা জেনে যায় তার বখাটে ভাই ও প্রভাবশালী বাবা এমনকি প্রতিক্রিয়াশীল চাচারা। একদিন হঠাৎ তারা মিস্টি আর জামাকাপড় নিয়ে হাজির হয় আর্চির ছোট ভাড়া বাসায়। প্রথমে ভয় পেলেও দুজন তাদের শান্ত মনোভাব দেশে খুশি হয়ে যায়। স্বপ্ন দেখে নিজের এলাকায় ফিরে যাবার। কিন্তু তাদের মনে ছিলো অন্য কিছু। বিয়োগাত্মক পরিণতির এই ছবির কথা দর্শকের মনে থাকবে অনেকদিন।

akash-thosar-rinku-rajguru-sairat

এই মুভিতে নেই ব্যয়বহুল গানের সেট। সেই আলো জ্বলমলে মঞ্চ। নেই নায়ক নায়িকার খোলামেলা দৃশ্য, ভালগার কিংবা আকর্ষণীয় পোষাক।আপনার কেবল মনে হবে পাশের গ্রামের দুটো কিশোর কিশোরীর অবুঝ পেমের ঘটনা ঘটছে আপনার চোখের সামনে। কোনো অতিরিক্ত চরিত্র কিংবা ভাড় নেই। নেই কোনো গুন্ডা মার্কা ভিলেন। কয়েকটি খুনো খুনো কিংবা প্রতিশোধের পর্বও নেই। এমনকি অতিকাল্পনিক কোনো বিষয় নেই। প্রেম জানাজানি হবার পর এক উচ্চবিত্ত পরিবারের স্বাধীন চেতা কিশোরী যে আচরণ করতে পারে তাই করেছে অর্চনা। একবার থানা থেকে বাপের সাথে ঘরে ফিরে যেতে চেয়েছিলো। প্রেমিকের গায়ে হাত তোলা ও প্রেমিক পার্শাকে চাচা ও ভাইদের বেদড়ক মারের দৃশ্য দেখে আবার গর্জে উঠে সে। এক পর্যায়ে একজনের কাছ থেকে নিয়ে নেয় পিস্তল। নিজেরা বাঁচতে গুলি ছুঁড়ে বিদ্রোহী বাঘিনীর মতো। নিজেদের ঘরের মেয়ের এমনরুপ দেখে তারা পিছু হটলেও তাদের মন থেকে ক্ষত শুকায়নি। তাই তারা কঠিন প্রতিশোধ নিয়েছিলো। এক জীবনে একটা প্রেমের জন্য বড়ো বেশী মূল্য দিতে হয়েছে দুই প্রেমিক প্রাণকে। একটি নিষ্পাপ শিশুর পায়ে রক্তমাখা পথচলার দৃশ্য দিয়ে পর্দা পড়ে ১৭৪  মিনেটের একটি অনবদ্য গল্পের।

নিটোল প্রেম দিয়ে নির্মল ভালোবাসার আবরনে যত্ন করে বানানো হয়েছে ছবিটি। নায়িকাকে মনে হবে পাশের বাসার কাশেম চাচার মেয়ে। নায়ক কে মনে হবে কোথায় যেন দেখেছেন বাস স্টপেজ কিংবা চার রাস্তার মোড়ে। ভাবছেন সে কি করে হয় মারাঠি লোক আমার চেনা হবে কেন? আসলে তাদের আউটলুকিংটা সেরকমই। প্রচলিত হিন্দি সিনেমা বা ভারতীয় সিনেমার ট্রাডিশনের  েবাইরে গিয়ে একটা অন্যরকম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন নাগরাজ। সবচেয়ে বড় কথা তিনি সফল হয়েছেন। মারাঠি না বুঝলেও ছবির গল্প বুঝতে কোনো সমস্যা হবে না। অবশ্য হিন্দি ডাবিংও মিলছে ইউটিউবে। এমনকি ইউটিউবে পাইরেটেড কপি প্রকাশিত হওয়ার পরও লোকেরা লাইন ধরে টিকেট কেটে ছবি দেখছে।

মুক্তির পরপরই বিপুল জনপ্রিয়তা পায় ‘সাইরাত’। কোনো কোনো প্রেক্ষাগৃহে বাড়তি ২টি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। একটি প্রেক্ষাগৃহে সর্বশেষ শো ছিল রাত ৩টায়। সব মিলিয়ে ১০০ কোটির বেশি আয় করে প্রথম কয়েকমাসেই । ৪ কোটি রুপির ‘সাইরাত’  বিগবাজেটের হিন্দি ছবিকে টেক্কা দিয়ে এখন পুরষ্কারের পাল্লাও ভারী করে চলেছে। পরিচালক চেয়েছেন এই ছবিতে এমন দুটি নতুন মুখ নিতে যারা দর্শকের কাছে পরিচিত নয়। পরিচালনা এবং অভিনয় সব দিকেই সফল সাইরাত। এর আগে মারাঠি ভাষায় সবচেয়ে আয়ের রেকর্ড ছিল ‘নাটসম্রাট’ চলচ্চিত্রের দখলে। ‘সাইরাত’ শুধু সে রেকর্ডই ভাঙেনি, প্রথম ১০০ কোটি রুপি আয়ের রেকর্ডও গড়েছে। এমডিবি রেটিংএেআছে ৯ দশমিক ১ এ।

পরিচালকের শ্যুটিং স্পটেই কাজ করত রিঙ্কুর মা, সেখানেই রিঙ্কুর সাথে পরিচালকের পরিচয়। রিঙ্কুকে দেখার কয়েকদিনের মধ্যেই পরিচালক তাকে তার সিনেমার মূল চরিত্রে অভিনয়ের জন্য বাছাই করেন। আর থোসারকে পরিচালক পেয়েছেন তার এক ভাইয়ের মাধ্যমে। তাদের সাথে কয়েকমাস থেকে পরিচালক তাদের চরিত্রগুলো তাদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন।

সৈরাট বা সাইরাত ছবির সঙ্গীত পরিচালনায় এই প্রথম হলিউডের সনি স্কোরিং স্টেজে কোনও ভারতীয় ছবির সঙ্গীত রেকর্ড করা হয়েছে। সঙ্গীত পরিচালক জুটি অজয়-অতুলের কাজ করেছেন এই চলচ্চিত্রে। সম্পাদনা করেছেন কুতুব ইমানদার।

sairat-660x330

সাইরাত দেখে টুইটারে একাধিক মন্তব্য পোস্ট করেন উচ্ছসিত অভিনেতা আমির খান। ছবিটি সকলের দেখা উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেছেন। শুধু আমিরই নন, এই ছবির প্রশংসায় মুখর হয়েছেন অভিনেতা ইরফান খান, আয়ুষ্মান খুরানা এবং পরিচালক তথা চিত্রনাট্যকার অনুরাগ কাশ্যপসহ সমগ্র বলিউড। ৬৬তম বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সাইরাত জেনারেশান ১৪প্লাস সেকশানে প্রদর্শিত হয়। এছাড়া জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে বিশেষ জুরি পুরস্কার পান ছবির নায়িকা রিংকু রাজগুরু।

নিচের তথ্যগুলো উইকিডিপিয়া থেকে নেয়া

পরিচালক নাগরাজ মানজুল
প্রযোজক নাগরাজ মানজুল,
নিতিন কেনি,
নিখিল সানি
গল্পকার নাগরাজ মানজুল

অবিনাশ এইচ ঘাটগে

অভিনেতা আকাশ থোসার ও রিঙকু রাজগুরু।
সুরকার অজয়-অতুল
চিত্রগ্রাহক সুধাকর রেড্ডি ইয়াক্কান্তি
সম্পাদক কুতুব ইনামদার
স্টুডিও ইসেল ভিশন প্রোডাকশান, আতপাত প্রোডাকশান, জি স্টুডিও
মুক্তি ২৯ এপ্রিল ২০১৬
দৈর্ঘ্য ১৭৪ মিনিট

Published : জানুয়ারি ৪, ২০১৭ | 3735 Views

  • img1

  • Helpline

    +880 1709962798