নারায়নগঞ্জের জানা অজানা

Published : অক্টোবর ২৯, ২০১৬ | 1604 Views

নারায়নগঞ্জের জানা অজানা
১৭৬৬ সালে  হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতা লক্ষীনারায়ণ  প্রভু নারায়ণের সেবার ব্যয়ভার বহনের জন্য একটি দলিলের মাধ্যমে শীতলক্ষা নদীর তীরে অবস্থিত মার্কেটকে দেবোত্তর সম্পত্তি হিসেবে ঘোষণা করেন। তাই পরবর্তীকালে এ স্থানের নাম হয় নারায়ণগঞ্জ। মুসলিম আমলের সোনার গাঁ নামের উদ্ভব প্রাচীন সুবর্ণগ্রামকে  কেন্দ্র করেই।  নারায়নগঞ্জের প্রাণ আসলে শীতলক্ষা নদী। নরসিংদীর টোকবর্গী থেকে মুন্সীগঞ্জের মোহনা পর্যন্ত দীর্ঘ ৬৫ মাইল শীতলক্ষ্যা নদী নারায়ণগঞ্জের ওপর দিয়ে প্রবাহিত।
রপ্তানী শিল্পে পাট যখন বাংলাদেশের প্রধানতম পণ্য, তখন নারায়ণগঞ্জ “প্রাচ্যের ডান্ডি” নামে খ্যাত থাকলেও বর্তমানে নিট গার্মেন্টস ও হোসিয়ারী হোসিয়ারী শিল্পের জন্য নারায়নগঞ্জ আগের মতোই দেশে বিদেশে বিখ্যাত।  নারায়ণগঞ্জ শহরে প্রায় ১ হাজার রপ্তানীমুখী গার্মেন্টস আছে।
বলা হয়ে থাকে ইংল্যান্ডের টেমস নদীর পর পৃথিবীর দ্বিতীয় ‘হারবার’ বেষ্টিত শান্ত নদী শীতলক্ষ্যা।  ইংল্যান্ডের ওষুধ কোম্পানিগুলো  এই নদীর স্বচ্ছ সুশীতল পানি ব্যবহার করতো। কোম্পানি এ অঞ্চলকে  ১৮৭৬ সালে মোট ৪.৫ বর্গমাইল এলাকাকে পৌরসভা  করে নেয়।  ১৮৬৬ সালে ঢাকার সাথে ডাক যোগাযোগ  শুরু হয ১৮৭৭ সালে টেলিফোন সার্ভিস চালু হয়।  নারায়ণগঞ্জ নৌবন্দরকে ১৮৮০ সালে ফ্রিপোর্ট ঘোষণা দেয় নদী ও সমুদ্র পথে নারায়ণগঞ্জের সঙ্গে  চট্টগ্রাম বন্দর, কলকাতাসহ  ও আসাম থেকে যাত্রী এবং মালামাল নিয়ে নারায়ণগঞ্জ নৌবন্দরে স্টিমার ভিড়তো।   এ জন্য নারায়ণগঞ্জকে বাংলা ভ্রমণের প্রবেশদ্বার বলা হতো।  ১৮৮৫ সালে নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-ময়মনসিংহ ট্রেন সার্ভিস চালু হলে পুরো ভারতবর্ষের সাথেই নারায়নগঞ্জের মেলবন্ধন তৈরী হয়।
লোকশিল্প যাদুঘর
সোনারগাঁয়ের অন্যতম আকর্ষণ লোকশিল্প জাদুঘর। গ্রামীন জীবনের নানা তৈজসপত্র, আমাদের লোকজ ঐতিহ্য ও লোকজ শিল্পের অনেক কিছুই স্থান পেয়েছে এখানে। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত এই জাদুঘর লোকশিল্প ফাউন্ডেশ এর তত্বাবধানে পরিচালিত হয়। পানাম নগরী ও লোকশিল্পন জাদুঘরের অবস্থান পাশাপাশি। ঢাকা হতে বাস যোগে সোনারগাঁয়ের মোগড়াপাড়া বাসষ্ট্যান্ড যেতে হবে। মোগড়াপাড়া হতে ১০-২০ টাকা ভাড়ায় রিক্সা/অটোরিক্সা যোগে পানাম নগরীতে পৌঁছা যায়।

জামদানী পল্লী
সোনারগাঁও অঞ্চলের জামদানি ও মসলিনের কাপড় তৈরির ইতিহাস প্রায় সাড়ে ৪ শত বছরের পুরোনো। ইতিহাস খ্যাত মসলিন কাপঙ প্রচীনকালে এখানে তৈরী হতো।আজকের প্রজন্ম গর্ব করতে পারে যে, গবেষনায় দেখা গেছে মিশরের মমির শরীরে পেচানো মসলিন এই সোনারগাঁয়ে তৈরী। বর্তমানে রুপগঞ্জের দিকে জামদানি শিল্প টিকে থাকলেও মসলিন শিল্প আজ পুরোপুরি বিলুপ্ত।

সেন শাসন যুগে বিক্রমপুর যখন রাজধানী, তখন ঢাকার কাছাকাছি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল ছিল সোনারগাঁ। সোনারগাঁ কেন্দ্রের অবস্থান শীতলক্ষ্যা নদীর আনুমানিক আট কিলোমিটার পূর্বে। বখতিয়ার খলজির হাতে নদীয়া পতনের আগে সোনারগাঁ ছিল সেনদের অন্যতম শাসনকেন্দ্র। নদীয়া থেকে বিতাড়িত লক্ষ্মণ সেন বিক্রমপুরে চলে আসার পরও সোনারগাঁ গুরুত্বপূর্ণ শহর হিসেবে পরিচিত ছিল। ফার্সি গ্রন্থ তবকাত-ই-নাসিরির লেখক মিনহাজ-ই-সিরাজের বর্ণনা অনুযায়ী ১২৬০ খ্রিস্টাব্দেও ‘বঙ্গ’ লক্ষ্মণ সেনের উত্তরসূরিদের শাসনাধীনে ছিল। তবকাত-ই-নাসিরিতে সোনারগাঁয়ের নাম উল্লিখিত হয়। মধ্যযুগের শুরু থেকেই সোনারগাঁ ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ ।

ফিরোজ শাহ চতুর্দশ শতাব্দির প্রায় প্রথমদিকে এই অঞ্চল নিজেদের দখলে নিয়ে নেন এবং তা অন্তর্ভুক্ত করেন লখনৌতি রাজ্যের। একটি বন্দর ও টাঁকশাল শহর হিসেবে গুরুত্ব পেতে  ১৩৩৮ থেকে ১৩৫২ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত সোনারগাঁ ফখরুদ্দিন মোবারক শাহ প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন রাজ্যের রাজধানীর মর্যাদা লাভ করে।  ১৩৩৮ খৃস্টাব্দে সুলতানের মৃত্যু ঘটলে সোনারগাঁয়ের শাসনকর্তা বাহরাম খান বিদ্রোহ ঘোষনা করেন।পরে ১৩৫২শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ সোনারগাঁ দখল করেন এবং  এখান থেকে একসময় মুদ্রাও জারি করা হয়।
সোনারগাঁয়ের একটি অংশে ঊনবিংশ শতাব্দির শেষ থেকে বিংশ শতাব্দির প্রথমদিকে গড়ে উঠেছিল পানাম নগর। নানা স্থাপত্য নিদর্শন থেকে এটা সুস্পষ্ট যে, বর্তমান পানাম নগর ও খাস নগরের মধ্যবর্তী এলাকার বিস্তৃত হিন্দু আমলের রাজধানী শহর মুসলিম আমলে সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত হয়নি, সম্ভবত এই স্থানে প্রথমদিকের মুসলিম শাসনকর্তাদের আবাসস্থল ছিল। মোগল আমলেরও পূর্বে খিজিরপুর, কদমরসুল ও মদনগঞ্জ বাণিজ্যিক অঞ্চল এবং আন্তর্জাতিক নদীবন্দর ছিল। পলাশী যুদ্ধের পর শীতলক্ষ্যা নদীর পশ্চিম পাড়ের গুরুত্ব বাড়তে থাকে।

সুদুর বাগদাদ নগরী থেকে দিল্লী আধ্যাতিœক সাধু সম্রাট শাহ ফতেহউল্লাহ্ ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে এখানে আসেন। পরবর্তীতে তাঁর মৃত্যুর পরে এখানেই কবরস্থ করা হযতার নাম থেকেই বুডড়গঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত সুফী সাধকের স্মৃতি বিজডড়ত এক সময় পরগনা নামে পরিচিত এই এলাকার একটি অঞ্চল ফতেহউল্লাহ্ বা ফতুল্লা নামকরন করা হয়।
সোনারগাঁও সভ্যতার বয়স ইতোমধ্যে দেড় সহগ্র বছর  পেরিয়ে গেছে। উয়ান চুয়াং এর মতো বিশ্বখ্যাত চৈনিক পন্ডিত এবং তিববতীয় ইতিহাস প্যাগ সাম জ্যাং জং এর বিবরণ মতে সুবর্ণগ্রাম বা আধুনিক সোনরগাঁয়ের।  প্রাক সুলতানি যুগে সুবর্ণগ্রাম একটি আভ্যন্তরীন আর্ন্তজাতিক নদী বন্দর হিসেবে এর অস্তিত্ব এ উপমহাদেশের পরিধি ছাপিয়েও বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপ্ত হয়েছিল। অজানা গ্রীক নাবিকদের লেখা ‘‘পেরিপ্লাস’’ গ্রন্থ থেকে। পেরিপ্লাস গ্রন্থের অজানা নাবিকেরা ব্রহ্মপুত্রের তট বেয়ে এ অঞ্চলে যাতায়াত ছিল মূলত এ বদ্বীপের সমৃদ্ধ বস্ত্র শিল্পের জন্য। সুবর্ণগ্রামের পৃথিবীখ্যাত চারু ও কারু শিল্প জাত দ্রব্যাদির জন্যই এখানে আসা বিচিত্র কিছুই ছিল না গ্রীক নাবিকদের।
হিন্দু পুরানে দেখা যায় রানী কৈকিয়ির আব্দার ছিল সুবর্ণগ্রামের সুক্ষ্ম বস্ত্রের জন্যে।  সুগন্ধিজাত মশলা রপ্তানিতেও সুবর্ণগ্রাম বন্দর নগরীর উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল।  প্রাচীন বৌদ্ধ দোহার সুক্ষ্ম কার্পাসিক বস্ত্র যে কার্পাস থেকে উৎপত্তি হতো ।

ছবি: সোনার গাঁয়ের রয়েলে রিসোর্ট

ইন্টারনেট অবলম্বনে- জাহাঙ্গীর আলম শোভন

Published : অক্টোবর ২৯, ২০১৬ | 1604 Views

  • img1

  • Helpline

    +880 1709962798