কম্যুনিটি ট্যুরিজম: সংকট ও সমাধান

Published : সেপ্টেম্বর ২৭, ২০১৬ | 1514 Views

কম্যুনিটি ট্যুরিজম

কম্যুনিটি ট্যুরিজম: সমস্যা ও সাম্ভাব্য সমাধান

জাহাঙ্গীর আলম শোভন

স্থানীয় জনগনকে সম্পৃক্ত করে  কোনো এলাকায় পর্যটকদের জন্য বিভিন্ন সেবা ও সুবিধার আয়োজন করে সে এলাকাকে একটি ইকো ট্যুরিজম এলাকায় রুপ দেয়ার সামাজিক  উদ্যোগকে বলে কম্যুনিটি ট্যুরিজম।

একটি নির্দিষ্ট এলাকাকে টেকসই পর্যটন স্থান হিসেবে গড়ে তোলা যায় কম্যুনিটি ট্যুরিজম এর মাধ্যমে। কম্যুনিটি ট্যুরিজম হয়ে উঠতে পারে একটি এলাকার আর্থসামাজিক উন্নয়নের অন্যতম হাতিয়ার।

কম্যুনিটি ট্যুরিজম:

আমাদের দেশে এটা নতুন হলেও বিশ্বজুড়ে এটা খুব সফল একটা উদ্যোগ। মঙ্গোলিয়াতে কমুউনিটি বেজড টুরিজম ব্যাপক সফল একটি পদক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।। কম্বোডিয়াও এক্ষেত্রে ঈর্ষনীয় সাফল্য ছু’তে পেরেছে। যেমন ১৯৯৮ সালে কম্বোডিয়ায় আসা পর্যটক সংখ্যা ছিলো ৯৬ হাজার আর  সে বছর বাংলাদেশে ছিলো বাংলাদেশে ১ লাখ ৫০ হাজার।  এর মধ্যে কম্বোডিয়ার বেশকিছু এলাকায় কমুইনিটি বেজড ট্যুরিজম প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। আর কয়েকবছরের মধ্যে বদলে যায় সেখান দৃশ্যপট। ২০০৬ সালে  এসে কম্বোডিয়ায় পর্যেটকের সংখ্যা দাড়ায় ২০ লাখে , আর বাংলাদেশ কোনোরকমে দুই লাখে পৌঁছতে পেরেছে। এটা ২০০৬ সালের কথা।

এবার আসি এই নতুন ধারণা বাস্তবায়নে বাংলাদেশে কি কি সমস্যা বিরাজমান এবং কি কি সমস্যা হতে পারে। এবং এগুলোর সমাধান সম্পর্কে আলোচনা করা যেতে পারে।

কম্যুনিটি ট্যুরিজম বাংলাদেশ

এক: দৃষ্টিভঙ্গি জনিত সমস্যা:

আমাদের দেশের মানুষ খুব বেশী ধর্মপরায়ন না হলেও। দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপারে যথেষ্ঠ গোঁড়া। বিদেশী ইহুদি খ্রিষ্টানকে সাম্প্রদায়িক দৃস্টিতে দেখতে পারে। বিদেশীদের খোলামেলা পোষাক তাদের সংস্কৃতির অংশ। এটা জনগনকে উপলব্দি করতে হবে। অন্যের সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। বিদেশীদের মদ্যপান মানে রাস্তায় মদখেয়ে মাতলামী নয়। এটাও তাদেরকে জানাতে হবে। তা না হলে রুট লেবেলে পর্যটন ছড়িয়ে পড়লে জনসাধারণ এর মাঝে বিভ্রান্তি ছড়াতে পারে। এবং এতে ভুল বুঝাবুঝির সৃস্টি হতে পারে। এবং বিদেশীদেরকেও এদেশের সংস্কৃতি সম্পর্কে ওয়াকীবহাল করতে হবে।

এজন্য অন্য সংস্কৃতি সম্পর্কে তাদের জানাতে হবে। শিক্ষা, জ্ঞান ও প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা থাকলে ভালো। সবচেয়ে ভালো হয়  কম্যুনিটি ট্যুরিজম পরিকল্পনা প্রণয়নের সময় প্রথমদিকে এমনসব এলাকা বাছাই করতে হবে। যেখানকার মানুষ উদার, সহনশীল ও বিদেশীদের জীবন দেখতে অভ্যস্ত।

img_0352

দুই: জেন্ডার সেনসিটিভিটি:

এটা খুব মারাত্বক এক সমস্যা। আমাদের দেশে এটা খুব বেশী। স্থানীয় জনসাধারণকে অবশ্যই একজন ট্যুরিস্টকে ট্যুরিস্ট হিসেবে দেখতে হবে। নারী বা পুরুষ হিসেবে নয়। একজন নারী ট্যুরিস্ট এর নিরাপত্তার প্রশ্ন রয়েছে। আমার একজন পুরুষ ট্যুরিস্ট ব্যাপারে একজন দেশীয় নারী সহযোগী, গাইড বা সেবাদানকারীর স্বচ্চন্দময় আচরনের প্রশ্ন রয়েছে।

এখানেও একই কথা খাটে।  কম্যুনিটি ট্যুরিজম এর সাথে সংশ্লিস্ট লোকদেরকে দেশবিদেশের নানা বিষয় সম্পর্কে জানতে এবং জানাতে হবে। এ ব্যাপারে একটা কোর্স ডিজাইন করে তাদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এবং এলাকার সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। কোনো কোনো ক্ষেত্র গেষ্ট এবং হোস্ট দুইপক্ষকেই কনসালটেন্সি দেয়ার প্রয়োজন হতে পারে।

 

রুহুল কুদ্দুছ ছোটন

তিন: নিরাপত্তা:

বাংলাদেশে নিরাপত্তা খুব গুরুত্বপূণর্ণ বিষয়। প্রথমে প্রয়োজন সড়ক দূর্ঘটনার ব্যাপারে সর্তক হওয়া । বাংলাদেশে ব্যাপক সংখ্যক মানুষ রোড এক্সিডেন্ট মারা যায়। এটা কখনো কখনো যুদ্ধ পরিস্থিতির সমান হয়।  এবং পরের বিষয় হলো চুরি ছিনতাই এর হাত থেকে একজন ট্যুরিস্টকে রক্ষা করা। দ্বিতীয়ত রয়েছে সামাজিক বিভিন্ন অপরাধ খুন সন্ত্রাস থেকে তাকে দূরে রাখা। এগুলো দেখার কারণে তার মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

একজন নারী ট্যূরিস্টকে খারাপ লোকদের হাত থেকে নিরাপদ রাখা। এবং বিদেশী নাগরিকদের জঙ্গিদের হাত থেকে সম্মিলিত প্রতিরোধের মাধ্যমে নিরাপদ ঘোষনা করা। এগুলো যতবড় চ্যালেঞ্জই হোক সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে জয় করা সম্ভব।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তিনস্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। প্রথমে স্পট নিরাপত্তা, যে স্থানে, বা বাড়িতে ট্যুরিস্ট থাকবে সেট সব দিকে থেকে নিরাপদ হতে হবে। সেখানে কোনো ধরনের নিরাপত্তা দূর্বলতা থাকতে পারেনা।

দ্বিতীয়ত: সামাজিক নিরাপত্তা  কম্যুনিটি ট্যুরিজম সংশ্লিস্ট সকলে ঐক্যবদ্ধ করে একে অপরের বিপদের সময় এগিয়ে আসার মাধ্যমে এই নিরাত্তা বিধান করা যায় এবং এলাকার সকল মানুষকে সচেতন করে এই নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।

তৃতীয়ত: স্থানীয় কতৃপক্ষ বা প্রশাসনিক নিরাপত্তা। এই পর্যায়ে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ, থানা, আনসার ভিডিপি প্রয়োজনে র‌্যাব বিজিবির সাহায্য নেয়ার সুযোগ থাকলে আরো ভালো। নিরাপত্তার কাজে এই তিনসারির লোকেরা একযোগে কাজ করলে আশা করি এই সমস্যার সমাধান করা যাবে।

rural_travel_india_intercultural_interaction

চার: ট্যুর বান্ধব উন্নয়ন:

একটি এলাকায় যাওয়ার জন্য রাস্তাঘাট। সেখান থেকে যোগাযোগের জন্য মোবাইল ইন্টারনেট। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পাওয়ার জন্য মার্কেটপ্লেস, পানীয়জল, হাসপাতাল এগুলো থাকা প্রয়োজন। এবং সেখানে স্থানীয় লোকদের উৎপাদিত খাদ্য ও পন্যসামগ্রীর প্রসার ঘটাতে হবে। থাকার জন্য পরিবেশ উন্নয়নও জরুরী। পর্যটকদের প্রয়োজনীয় পন্য ও সেবার সহজ সুন্দর সমাধান থাকবে যুক্তিসঙ্গত দামের মধ্যে। ব্যাংকিং, মানিছেঞ্জার ও স্থানীয় পরিবহন এমনকি গাইডের ব্যবস্থা থাকাও জরুরী।

টেকনাফ থেকে সেন্টমাটিন

পাঁচ, ট্যুর আকর্ষণ তৈরী করা:

আমাদের মনে রাখতে হবে উপরের শর্তগুলো পূরণ করার পরও  কম্যুনিটি ট্যুরিজম এলাকায় পর্যটক আসবে এমনটা মনে করার কারণ নেই। আপনি পর্যটকদের অবশ্যেই রিজন বা কারণ দেখাতে হবে। আমাদের দেশে ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানের বাইরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন হয়না বললে চলে। পর্যটকরো একটি এলাকা ও সেখানকার সংস্কৃতি এবং বিশেষত্বকে জানতে বা বুঝতে সেখানে ভিজিট করবে। আমরা যদি সেগুলো আনুষ্ঠানিক ভাবে উপস্থাপন না করি। তাহলে সেটার দেখার জন্য কেউ আসবেনা। এজন্য আমাদের একেকটা এলাকায় একেকটা সংস্কৃতিক উৎসব এক এক সময়কে ঘিরে ঘোষনা করতে পারি।

যেমন: এপ্রিলে ঢাকায় বৈশাখ বরণ, বান্দরবানে বৈশাবী।

অকটোবরে সুন্দরবনের রাসমেলা, সীতাকুন্ডে দূর্গাপুজা, কুস্টিয়ায় ঈদ। এভাবে কোনো এলাকায় নৌকাবাইচ। কোনো এলাকায় ঘুমগুটি। কোনো লোকজ সংস্কৃতি মেলা, কোনো এলাকায় লোকজন ক্রীড়া উৎসবকে ঘিরে পর্যটনকে উৎসাহিত করা যায়।

এমনকি সারাদেশে যেসব শত শত মেলা হয় এগুলোকে কেন্দ্র করে সেসব এলাকায় ‍অন্যান্য সুবিধা বৃদ্ধি করা যায়।

আমাদের ঘরের পাশের একটা উদাহরণ দিয়ে লেখাটা শেষ করতে চাই। আমাদের প্রতিবেশী ভারত সামাজিক পর্যটনের এই উদ্যোগ থেকে সফলতা  পেতে শুরু করেছে। কমিউনিটি ট্যুরিজমের মাধ্যমে শিলিগুড়িতে চুইখিম নামে এক অখ্যাত পাহাড়ি গ্রাম  ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। শুধু পর্যটন স্পটই নয় কমিউনিটি ট্যুরিজমের প্রভাবে ওই গ্রামের অধিবাসীদের মদপানের অভ্যাস আস্তে আস্তে চলে গেছে। এ ধরনের সামাজিক সাফল্য আমাদেরর প্রয়োজন । বিশেষ করে ২/১টা উদারহন তৈরী করতে পারলে তার প্রভাব পড়বে সারা দেশে।

Published : সেপ্টেম্বর ২৭, ২০১৬ | 1514 Views

  • img1

  • সেপ্টেম্বর ২০১৬
    সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
    « আগষ্ট   অক্টোবর »
     
    ১০১১
    ১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
    ১৯২০২১২২২৩২৪২৫
    ২৬২৭২৮২৯৩০  
  • Helpline

    +880 1709962798