গানের মাঝে প্রাণের স্পন্ধন

Published : সেপ্টেম্বর ২৬, ২০১৬ | 1360 Views

গানের মাঝে প্রাণের স্পন্ধন
জাহাঙ্গীর আলম শোভন

মানুষ সভ্য। মানুষ শ্রেষ্ঠ। একথাগুলোর সভ্যতার প্রমাণ শুধু মানুষের উদ্ভাবনী শক্তি, পরিবর্তনশীলতা, মানবিক গুণেই পাওয়া যায় না। মানুষের ভাবাবেগের, হৃদয়গ্রাহী প্রকাশ এবং সংস্কৃতি সূত্রেও প্রমাণিত। সংস্কৃতি এবং সভ্যতার যে মেলবন্ধন মানবজাতির আতুর ঘরে প্রোথিত হয়েছে তাই মহীরুহ হয়ে প্রকাশিত হয়েছে সমাজ ও রাষ্ট্রে। সর্বোপরি মানুষের আত্মিক পরিচয়ে। মানুষ এ জন্যই মানুষ যে, সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, হাসি-কান্না, চাওয়া-পাওয়া, এসবের বর্ণিল প্রকাশ প্রাণী জগতের মাঝে কেবল মানবচিত্তেই দেখা যায়। এ সকল অনুভূতি প্রকাশ পায় নানাবিধ প্রকৃতির সুবর্ণ ঢং-এ। কখনো কখনো তা হয়ে ওঠে সুললিত, সুসজ্জিত, ছন্দিত, ব্যঞ্জিত ও সুরেলা। অনুভূতি আর কথামালার সুরেলা প্রকাশই গান। গান এ দেশের মানুষের প্রাণের সঙ্গে মিশে ছিল, মিশে আছে। কি ফসল বোনা, কি বিয়ে, কি নবধাতু, কি ধান কাটা, কি অবসর সব কিছুতে গান। বলা যায় গান বাংলা ভাষাভাষীদের জীবনেরই একটা অংশ। গানের এমন ব্যবহার আর কোথায় মেলে? গানের জীবনের সম্পর্ক এবং গানের বহুমাত্রিকতা। বিষয়ের সার্বভৌমত্ব। সুরের ঝংকার সবই অপূর্ব, অনন্য।
গ্রামীণ জীবনের গানের প্রভাব তথা গানে জীবনের আচ্ছাদন জন্মের সঙ্গেই সূচিত হয়। গ্রাম-বাংলার একটি ঘরে একটি নবজাতকের জন্মের সঙ্গেও গানের সুর বাঁধা থাকে। যেমন_
আনন্দ, আনন্দ গো বালির-বালির বড় আনন্দ মনগো
বালির ঘরে হইছে উদয় পূর্ণিমার ছানগো
এইনা শুইনা দাদায় আইছে লাল গামছা লইয়ারে
তোমরা থাকো আমরা নাচি নাতি কোলো লইয়ারো।
এরপর শুরু হয় ঘুম পাড়ানি গান। ছেলে ভুলো না গান, আর এসবের ছাছে ছাছে সাজানো থাকে হৃদয়ের উচ্ছ্বাস, গ্রাণের কল্লোল, আশা আকাঙ্ক্ষার বীজ, আর নিজ হাতে বোনা স্বপ্ন।
খোকন আমার চাদ মণি
মিষ্টি হাসি মুখ খানি
খোকন থাকে কোনখানে
শত দলের মাঝখানে।
ঘুমাও ওগো নন্দিনী
ঘুমের দেশের হও রানী।
এমনি মিষ্টি আর আবেগঘন ছড়া ছড়িয়ে আছে গ্রামীণ জীবনে রন্ধ্রে রন্ধ্রে। ঘুম পাড়ানী মাসি পিষি আয়রে পাখি আয়না আয়রে ছেলের দল আগডুম বাগডুমসহ অনেক ছড়া ইতোমধ্যে স্থান করে নিয়েছে পাঠ্য বইগুলোতে।
কিন্তু এতেই আমাদের সন্তুষ্ট থাকার যৌক্তিকতা নেই। এখনো বাংলার জনপদ জুড়ে এমনি আরো অনেক ছড়া আওড়াচ্ছে খোলা মাঠে চরে বেড়ানো গ্রাম-বাংলার দুরন্ত স্বাধীন শিশু-কিশোররা।
বিয়ের গানের ক্ষেত্রেও পল্লী সাহিত্যের রয়েছে ঈর্ষণীয় সমৃদ্ধি। নারী এবং পুরুষের কাঙ্ক্ষিত সামাজিক বন্ধন একদিকে মধুর, অন্যদিকে আবার বিষাদত্ত। মানব মনের বিরহ-মিলনের অনুভূতির গভীরের ভাবটি যেন নিংড়ে পড়ে বিয়ের গানগুলোতে অঝোরধারায়। আত্মার গভীরে প্রোথিত শিকড়কে বিয়ের লগ্নের আনন্দ সংবাদ হতে শুরু করে বিয়ের কনে ও মা-বাবার মাঝে যে শাশ্বত দূরত্ব তৈরি তার মর্মস্পর্শী সুর গ্রামীণ বিয়ের গানের আনন্দকে ঢেকে দেয় অশ্রুসজল দৃষ্টি রেখায়। যেমন গায়ে হলুদ পর্বে গাওয়া হয় :
একদিন আছি হলদি বানিয়ার দোকানে
আজ কেন আইলারে হলদি রূপসী বদনে নারে
কনে সাজ পর্বে গাওয়া হয় :
লীলাবালি লীলাবালি বড় যুবতি সইগো
কী দিয়া সাজাইমু তরে
মেহেদী পর্বে গাওয়া হয় :
পাগল হইবো সাধু, পাগল হইবো সাধু
পরদেশি নাগর
সুন্দরী কইন্যার মেন্দির যাদু রূপের যাদু
সুখের হইবো বাসর।
এছাড়া বরকে বরণ। কনে বিদায় প্রতিটি ধাপে ধাপে রয়েছে গায়ের মাটিমাখা দরদী সুরের আবেগী প্রকাশ। আধুনিকতার ছোঁয়ায় আজকাল বিদেশি সংস্কৃতি এসব গ্রাস করতে বসেছে। আমরাও নতুনত্বের নামে, বিলাসিতার নামে আভিজাত্যের নামে আমাদের স্বকীয়তা আর নিজস্ব সংস্কৃতি উপেক্ষা করি। যা একটি আত্মমর্যাদাশীল জাতির জন্য স্ববিরোধী বলা যায়।
বাংলার নারী বাংলা গান যেন পরস্পর সমার্থক, নারী মনের কথা বলতে পারে না অবলা বলে যে অপবাদ দেয়া হয় তা অনেক ঘুচে যায় বাংলার পল্লী গানে নারী হৃদয়ের সমস্ত উচ্ছ্বাস সকল আকুতি যেভাবে প্রকাশিত তা দ্বারা। বিশেষ করে বিয়ের পর বাঙালি ললনা যখন স্বামীর বাড়ি যায় তখন তার তুলনা আজকের বাংলা গান কিংবা বিদেশি সুর কোনো কিছুতে ফুটে ওঠার কথা নয়।
ইলিশ মাছের তিরিশ কাটা বোয়াল মাছের দাড়ি
ছকিনারে নিতে আইছে চানপুরের গাড়ি।
সংসারের আনন্দ, বিরহ এবং আশা-আকাঙ্ক্ষার এমন বর্ণিল প্রকাশ আর কোথায় মেলে?
শুনছেননি শুনছেননি আম্মা পাইছিননি খবর
কাল রাত্রে স্বপ্নে দেখছি আমরা বাপের কবর।
এখনো নাইওরি গানে আচল ভিজে বাংলার লাজরাঙা বধূ। এখনো এসবের আবেদন শেষ হয়ে যায়নি।
কে যাওরে ভাটির গাং এ নাইয়া
আমার ভাইজানরে কইও নাইওর নিতো আইয়া।
শুধু তাই নয় স্বামীর প্রতি বাঙালি নারীর প্রেমও ধরা দিয়েছে পল্লী গানে। যে কথা ঘরের বউ প্রতিদিন প্রতিরাত বলতে পারে না সে কথার প্রতিধ্বনিই থেকেই আবার জন্ম নেয় এসব রোমান্টিক গান।
আমার সোনার ময়না পাখি
কোন দেশে গেলে উইড়া দিয়া মোরে ফাঁকি_
চাষীর গানের মাঝে ফসল তোলার আনন্দ। মাঝির গানে পথ চলার অক্লান্তি। গাড়িয়ালের গানে দূর গমনের বিরহ। নিঃসঙ্গ বধূর গানে মিলনের আকুতি। বাউলের গানে ঘর ছাড়ার সুর। এমন জীবনমুখী ব্যবহারিক সঙ্গীতচর্চা শুধুমাত্র বাংলায় মেলে।
কবি গান এখন দেশের অনেক অঞ্চলে স্তিমিত। পক্ষ-বিপক্ষে সেজে মুখে মুখে কথা সাজিয়ে সুরের লহরীতে দর্শক মাতানো সে ঐতিহ্য আজ ম্রিয়মাণ। পালাগুলোতে সুরের কল্লোলে জীবনের যে কাব্য গাথা হয়েছে, তা আমরা টের পেয়েছি ময়মনসিংহ গীতিকা সামনে আসার পর। আর কবি জসীমউদ্দীনের গীতিকাব্যে যত্ন পাওয়ার পর।
দাদার দিনের টাকা দিয়ারে
তুই কানিরে করছি বিয়া।
অথবা আমার আল্লা কোথায় রইলোরে এ সময় কালে
অথবা এই খানে কথা রহক মজিয়া
রাজা বেটার কথা এমন কিছু যাই বলিয়া।
এসব অমূল্য সম্পদের আধার।
সুরে আর গানে জীবনের এসব কাহিনীনির্ভর সাহিত্য শ্রোতাকে নিয়ে যায় আনন্দ, ভাব, চিন্তার এক বাস্তব ও কল্পনার মিশেল জগতে। এক সময় এসব গানে ভাবে গম্ভীরের অভাবের কথা বলা হলেও পরে দেখা গেছে ভাষা সহজ, সরল হলেও এসবের দর্শন তত্ত্বও গভীরতা যে কোনো সার্থক শিল্পকর্মের চেয়ে কম নয়। তাই এসব আমাদের সমৃদ্ধি। আর এসব গৌরবের ভাগীদার আমাদের পূর্ব প্রজন্ম।

Published : সেপ্টেম্বর ২৬, ২০১৬ | 1360 Views

  • img1

  • সেপ্টেম্বর ২০১৬
    সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
    « আগষ্ট   অক্টোবর »
     
    ১০১১
    ১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
    ১৯২০২১২২২৩২৪২৫
    ২৬২৭২৮২৯৩০  
  • Helpline

    +880 1709962798