নেপালের নারী

Published : সেপ্টেম্বর ২১, ২০১৬ | 3027 Views

নেপালের নারী

নেপালের নারী

জাহাঙ্গীর আলম শোভন,  নেপাল সফরের পর:
সারাবিশ্বেরই নারী অধিকার বাস্তবায়ন, নারীদের নিরাপত্ত এক কঠিন কাজ। এটা সভ্যতার একটা সংকট হতে পারে, দূর্বলতাও হতে পারে। উন্নত দেশগুলোতে নারী নিপীড়নের যে হার দেখা যায় তাতে নারীমুক্তি কি সেই তিমিরেই থেকে যাবে কিনা এটা একটা প্রশ্ন বটে। আর যেখানে শিক্ষার আলো বঞ্চিত রয়েছে নানা স্থানীয় সংস্কার তারউপর দূর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থা সেখানে চ্যালেঞ্জ হয়তো কয়েকশগুণ বেশী। কয়েকগ্রাম যেখানে বাদবাকী পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন সেখানে নারীদের বঞ্চনার খবর নেয়াটাইতো কঠিন। আর যেখানে শপিং করার জন্য পাহাড়ী পথে ৭ ঘন্টা হাটতে হয়, অথবা একটা রুটি কেনার জন্য চার ঘন্টার রাস্তা সেখানে একজন প্রসূতি মায়ের চিকিৎসা কতো জটিল হতে পারে। চিন্তা করাই যায়না। হ্যাঁ পর্বত বেস্টিত হিমালয়ের দেশ নেপালের কথা বলছি।

 

নেপালের নারী

( নেপালের নারীরা আসলে ঘরে বাইরে সমান তালেই সামলায় সব)

প্রায় ২৩ মিলিয়ন জনসংখ্যা অধ্যুষিত দেশটির অর্ধেকই নারী। তবে জীবনের প্রয়োজনে পারিবারিক জীবনে আর্থিক খাতে নারীর অংশগ্রহণ বাংলাদেশ ও ভারতের চেয়ে ভালো। এটা খুব সহজে চোখে পড়ে। শহরের রাস্তায় সর্বত্র নারী পুরুষের সমান উপস্থিতি রয়েছে। এমনকি ফুটপাতে ফলবিক্রেতার হকারদের মধ্যেও নারীদের সংখা উল্লেখযোগ্য। মফস্বলের ছোট হোটেল, লজ, দোকানে নারীদের অংশগ্রহণ পুরুষদের তুলনায় বেশীই বটে। বর্তমানে মালয়েশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে নেপালের প্রচুর পুরুষ এবং নারী কমীদের কর্মসংস্থান হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, পরিবারের পুরুষ সদস্য বিদেশ আর দেশে নারী সদস্যরা খেতে-খামারে কাজ করছে অথবা দোকান-পাট খুলে বসেছে। একটি পরিবারে সামনের দিকে একটি দোকান বা রেস্ট হাউস আর পেছনে তাদের বসবাসের বাড়ি। এমন হরদম চোখে পড়ে বিশেষ করে ট্যুরিজম এরিয়াতে। বেশ কয়েকটি রেস্টুরেন্ট খাওয়া-দাওয়া করলাম। মা ক্যাশে বসেছেন আর তার মেয়েরা বেয়ারার কাজ করছেন। সাথে বেতনভুক্ত হয়তো আরো দু’টো মেয়েও আছে। হাইওয়ে রেস্টুরেন্টগুলোতে মেয়েদেরকেই বেশি দেখেছি পুরুষদের চেয়ে।

এমনি একটা রেস্টুরেন্টে কথা বলছিলাম এরমালিক তথা মা তপতি রাণীর সাথে। তিনি বললেন, আসলে একসময় পুরো নেপালই কৃষিনির্ভর ছিলো। কিন্তু জনসংখ্যা আর মানুষের চাহিদা বৃদ্ধির কারণে সবাইকে বিকল্প পেশা বেছে নিতে হচ্ছে। বুঝলাম এধরণের ব্যবসা-বাণিজ্য যারা খুলতে পেরেছে তারা অন্যদের তুলনায় ভালোই আছে। কিন্তু যাদের ওই সামর্থটুকু নাই তারা ভারি বেকায়দায় আছে নেপালে। জিনিসপত্রের মতো চলাফেরার ভাড়াও অনেক বেশি নেপালে। আর পাহাড়ী উঁচু-নিচু রাস্তা, কাঠমাণ্ডুতে এক অংশে কিছু রিকশা দেখেছি। প্রধান চলাচল টেক্সিতে। বাস সার্ভিস আছে। কিন্তু ভাড়া অনেক বেশি। বাধ্য হয়ে নেপালীরা চড়ে মোটরবাইকে। ঢাকার রাস্তায় যেমন রিকশা আর রিকশা, নেপালের রাস্তায় সারি সারি মোটরসাইকেল। এখানেও পুরুষ এবং নারীর সংখ্যা সমান। ঢাকায় যেখানে ১% মহিলাও পাওয়া যাবেনা সেখানে নেপালে মোটরসাইকেল ধারী নারী পুরুষের সংখ্যা প্রায় সমান। যারা শহরে চাকুরী করেন। তাদের বেশীরভাগ লোকেরই একটি মোটরসাইকেল আছে সে পুরুষ হোক আর নারী হোক। যাদের এতোটুকু নেই তারা সত্যিই অসহায়। তাদের বেশী ভাড়া গুণে, ঝুলে লোকাল বাসে পাড়ি দিতে হয় পাহাড়ী উঁচু-নিচু রাস্তা। এখানে দোকান মালিক থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্যে ভারতীয় পণ্য ও ভারতীয়দের একচ্ছত্র আধিপত্য। নেপালের রাজনীতিও ভারতের অনুকুলে। অনেক নেপালী এজন্য রাজনীতিবিদদের প্রতি বেশ ক্ষুব্ধ।

শরনকোট নেপাল

( নেপালের শরনকোটে পাহাড়ের উপরে লেখক, পেছনে এক নেপালী নারীকে দেখা যাচ্ছে , যে রমনী এখানে ট্যুুরিস্টদের কাছে খাবার ও পানি বিক্রি করেন)

আর্থ সামাজিক কাজে নেপালের নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ থাকলেও নেতৃত্বে তাদের অবস্থানশক্ত নয়। সূতরাং পরিবার ও রাষ্ট্রের জন্য কাজ করেও নিজের অধিকারের বেলায় এশিয়ার অন্যদেশের মতো এখানেও নারীরা ভালো নয়। বিষয়টি আমাকে বেশ পীড়া দিয়েছিল। নারী পরিবার অথবা সমাজ গঠনে সমানভাবে অংশ নিয়ে কেন তার নিজের পাওনার বেলায় পিছিয়ে থাকবে। এ সত্যি অবিচার। কথা বলালাম একজন হিন্দু স্বামীজি নেপাল কংগ্রেসের সদস্য কো রিলেজিওন সংগঠক তামুদা গৌতম এর সঙ্গে। তিনি জানালেন, শিক্ষায় পিছিয়ে থাকা এর অন্যতম কারণ। আমার কাছে মনে হলো- ধমীয় ট্যাবু ও পুরুষতান্ত্রিক সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি এর প্রধান কারণ। এই বৈষম্যের সবচেয়ে বড় শিকার গ্রামের নারীরা। তারা একদিকে গৃহস্থালীর কাজ করে, কাজ করে মাঠে এমনকি বাজারে গিয়ে কলাটি পেরায়াটিও তাকে বিক্রি করতে হয়। কিন্তু দারিদ্রের টানাপোড়েন আর সামাজিক বৈষম্য নারীর মেরুদণ্ডকে বাঁকিয়ে রেখেছে হাজার বছর ধরে।

হিন্দু অধ্যুষিত দেশ নেপাল । এখানে হিন্দু আচার কঠোরভাবে পালন করা হয়। যেহেতু হিন্দু ধর্মে পিতার সম্পত্তিতে নারীর অধিকার নেই। সেহেতু একজন নারী শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড়াতেই পারেনা পরিবারের জন্য হাড়ভাঙা খাটুনি দেয়ার পরও। যদিও ২০০৬ সালের পর থেকে বেশকিছু সংস্থা নারীদের উন্নয়নের জন্য কাজ করছে।

শতকরা ৪% মুসলিম আছে নেপালে তাদের অবস্থা আরো করুণ। যদিও এদের একটা অংশ ভারত ও পাকিস্তান থেকে আসা। মুসলিমদের দ্বারা পরিচালিত একটি বিদ্যালয় পরিদর্শন করতে গিয়েছিলাম কাটমাণ্ডর কেন্দ্রস্থলেই। দেখলাম সারা কাঠমাণ্ডু শহরে মুসলিম মেয়েদের প্রাথমিক শিক্ষায় ইংরেজিটুকু পড়ানোর জন্য কোনো মুসলিম শিক্ষিকা পাওয়া যায়নি। এমনকি মাদ্রাসায় ইংরেজী অংক পড়ান হিন্দু নারী শিক্ষিকা এবং সেটা অন্য কোনো কারণে নয়। শুধুমাত্র ইংরেজী পড়াতে পারে এমন মুসলিম রমণীর অভাবে। একুশ শতকে এটা শুনে অনেকেই অবাক হতে পারে। শুনলে অবাক হবেন সেখানেও হুজুরেরা পান খায় প্রচুর। মাদ্রাসার আনাচে কানাচে পানের পিক পেলে অবস্থা কেরোসিন। যদি কাঠমুন্ডতে এই অবস্থা হয় তাহলে বিরাটনগর বা অন্য এলাকায় অবস্থা কেমন?

নেপালের নারীদের উন্নয়নের জন্য সরকার ৬ দফা প্যাকেজের বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। নারী কল্যাণের জন্য আলাদা মন্ত্রণালয় করা হয়েছে। বিশেষ করে নবম পরিকল্পনার মাধ্যমে সরকার কিছু কাজ করছে। এর মধ্যে তারা শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। কিন্তু দূর্গম পাহাড়ী অঞ্চলে এসব কাজকে ছড়িয়ে দেয়া সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে।

শিক্ষা ও চাকরীতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও সামাজিক অধিকার, নেতৃত্ব এবং সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ায় তারা বেশ পিছিয়ে এখনো। এ নিয়ে কথা বলেছিলাম নেপালের একটি টিভি চ্যানেলের নির্বাহী পরিচালক ইন্দিরা মানেন্দর সাথে। বললেন, নারীদের অগ্রগতি হচ্ছেনা তা নয়। কিন্তু সেটা খুব গতিশীল নয়। তবে বেশকিছু বিষয়ে নারীদের অগ্রগতি চোখে পড়বে।

নেপালের সংস্কৃতি বেশ সমৃদ্ধ তার পরিচয়ে মেলে এখানকার হেরিটেজগুলোতে। বাসায় গাড়িতে রেস্টুরেন্টে নেপালী গানের ব্যাপক শ্রুতি দেখেছি। নেপালে অনেকগুলো টিভি চ্যানেল রয়েছে। ভারতীয় সংস্কৃতির প্রভাব থাকলেও নেপালীরা নিজেদের সংস্কৃতিকে প্রাধান্য দেয়। রাস্তায় নেপালী মেয়েদের চলাফেরা বেশ স্বতস্ফূর্ত। মনে হলো এদের ইভটিজিং করার মতো কারো তেমন সময় বা প্রয়োজন নেই। বার বা ড্যান্স ফ্লোরগুলোতে নেপালী ও ভারতীয় মেয়েদের উপস্থিতি বেশ সচকিত। পর্যটন নির্ভর অর্থনীতি আর পর্যটন বান্ধব দেশে বহি:সংস্কৃতির গড্ডালিকা অথবা অর্থের পিছে টানাটানির ঘরের মেয়েরা ছুটলে সেটা আসলেই অবাক হওয়ার কিছু নেই।

রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা হোক আর সহিংসতার ঘটনা থাকুক যে কোনো কারণেই হোক রাজনীতিতে নেপালী নারীদের উপস্থিতি তুলনামূলক কম অন্যান্য সেক্টরের হিসেবে। এ বিষয়ে কথা বলছিলাম কয়েকজন নেপালির সাথে। তারা পুরুষকেন্দ্রীক সমাজব্যবস্থা আর অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতিকেই দায়ী করলেন।

নেপালী সংস্কৃতির উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো কুমারী পূজা। কুমারী পূজা ভারত ও বাংলাদেশেও হিন্দুদের মাঝে প্রচলিত আছে। কিন্তু নেপালে এর ঝাঁকজমক, ভাব- আবেগ অনেক বেশি। পুরো আনুষ্ঠানিকতাও বেশ অভিজাত। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো প্রতি বছর যে কিশোরী মেয়েটিকে কুমারী পূজার জন্য সাজানো হয়। নেপালে মেয়েটার আর বিবাহ হয় না। তাকে সারাজীবন কুমারী হয়ে থাকতে হয়। নেপালীদের ধারণা তার উপর দেবী ভর করেছে সূতরাং তার সাথে আর কোনো মানুষ সংসার করতে পারবেনা। তাদের মধ্যে এক ধরণের ভীতি কাজ করে। যদিও মেয়েটিকে সবাই ভক্তি শ্রদ্ধা করে এবং সরকার তাদের পূণর্বাসনও করে তথাপি মেয়েটি তার জীবনের স্বাভাবিক ইচ্ছা-আকাংখা থেকে বঞ্চিত হয়। এ বিষয়ে কয়েকটি সংস্থা পরিবর্তনের চেষ্টা করে এখনো খুব একটা সফল হয়নি। সাম্প্রতিক বছরসমূহে ২/১টা মেয়ে এই ট্যাবু ভাংতে চেয়েছিলো। কিন্তু এই খবর যথাসম্ভব গোপন রাখা হয়।

বাংলাদেশে প্রচুর নেপালী শিক্ষার্থী রয়েছে। যাওয়ার সময় বিমানে দেখলাম আমাদের সহযাত্রী ছিলো বেশকয়েকটি মেয়ে শুধু বাংলাদেশের বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রী তারা। ফেরার পথে আমাদের ফ্লাইটে আধিপত্য ছিলো নেপালীদের মূলত তারা ঢাকা হয়ে কুয়ালালামপুর যাচ্ছে জীবিকার সন্ধানে। তাতেও দেখলাম এক তৃতীয়াংশ নারী কর্মী।

তবুও মানুষ আশায় বুক বাঁধে। তাইতো নেপালী নারীরাও সুদিনের আশায় অথবা সন্তানের নিজেদের সফলতা খুঁজে নিয়ে সান্তনা খুঁজে বেড়ায় হয়তোবা।

Published : সেপ্টেম্বর ২১, ২০১৬ | 3027 Views

  • img1

  • সেপ্টেম্বর ২০১৬
    সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
    « আগষ্ট   অক্টোবর »
     
    ১০১১
    ১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
    ১৯২০২১২২২৩২৪২৫
    ২৬২৭২৮২৯৩০  
  • Helpline

    +880 1709962798