নোয়াখালীর লোকজীবন

Published : সেপ্টেম্বর ৮, ২০১৬ | 2273 Views

 নোয়াখালীর লোকজীবন
জাহাঙ্গীর আলম শোভন

 

বিশাল সমুদ্র এ এলাকার মানুষকে দূরজয়ের হাতছানি দিয়ে জাহাজ নৌকায় ছড়িয়ে নিয়ে গেছে দূর দেশে। প্রবাস পাড়ি দেয়ার ভীসন সাহসটা এখানকার লোকদেরকে বঙ্গোপসাগরই দিয়েছে। রেঙ্গুন, কলকাতা দিল্লী, আগ্রা, বোম্বে, করাচি ছাড়াও সি্ংগাপুর থাইল্যান্ড এ অঞ্চলের মানুষ জাহাজে চড়ে অবলীলার পাড়ি দিতো বলে বহু পরিবারের পূর্ব পুরুষদের ইতিহাস থেকে জানা যায়। আজো এ অঞ্চলে এধারা অব্যাহত আছে বিশ্বের বিভিন্ন মহাদেশে এ এলাকার বিপুল সংখ্যক লোক অবস্থান করছে। কেউ কেউ কোথাও স্থায়ী নিবাস বানিয়ে নিয়েছ।
সমুদ্র উপকুলবতী জেলা নোয়াখালি। সাগরের পলিমাটিতে গড়ে ওঠা এভূমির মাটির দাগ অনেক পুরনো নয়। তবে এখানকার ফেনী জেলার ছাগলনাইয়াতে পস্তরযুগের কিছু হাতিয়ার প্রমানকরে উত্তর পাশ্বের জনবসতি অনেক  ‍পুরনো। সাগরের সাথে এখানকার মানুষের মিতালী অনেক গভীর ও ঐতিহাসিক।  মাছধরা, কৃষি এবং ধর্ম। একয়টি জিনিস এখানকার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটা কুমিল্লার সাথে প্রাচীর সমতট জনপদের অন্তভূক্ত ছিলো। তবে কুমিল্লা জেলা যখন ত্রিপুরার শাষনে চলে যায়। তখন নোয়াখালী হরিকেল বা চট্টগ্রামের অধিভূক্ত ছিলো কিনা বা স্বাধীন ভূমি ছিলো কিনা তা জানা যায়না। মোঘল আমলে চট্টগ্রামের সাথে এর প্রশাসনিক এলাকা যুক্ত থাকলেও বৃটিশ আমলে এটা আলাদা প্রশাসনিক এলাকার মর্যাদা পায়। বৃটিশ আমলের প্রথম দিকে নোয়াখালী, রংপুর, ঢাকা, ও মোমেনশাহী এই চারটি জেলা কালেক্টরেটের সাহায্যে বাংলা দেশ শাসন করা হতো।
নোয়াখালী বলতে যদিও আমরা বৃহত্তর নোয়াখালী বা বর্তমান ফেণী নোয়াখালি লক্ষ্মীপুরকে বুঝি। নোয়াখালি কালচারের বিস্তৃতি আরো বেশী। চট্টগ্রাম জেলার মিরশ্বরাই, ”চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ, কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রাম, লাকসাম, লাঙ্গলকোট প্রভৃতি এলাকা নোয়াখালির সংস্কৃতি বলয়ের মধ্যে অবস্থিত। ঐতিহাসিকভাবে বাঙ্গালী জাতিস্বত্ত্বার অন্তর্গত এখানকার মানুষরা মিশ্র বাঙ্গালী জাতিরই প্রতিনিধি। আকৃতি প্রকৃতিতে এরা বিশেষ আলাদা না হলেও ভাষায় কিছুটা আলাদা, যদিও নোয়াখালি আঞ্চলিক ভাষার মূল বাঙলা ভাষাই। এখানে চট্টগামের ভাষার সাথে সাদৃশ্য থাকলেও এতে আরাকানি প্রভাব নেই। অথবা সিলেটি ভাষার মতো গঠনগত দূরত্বও মূল বাংলার চেয়ে বেশী নয়।
কৃষি ও মাছধরা ছাড়াও জীবনের প্রয়োজনের জাহাজ প্রবাসের পেশা বেছে নিয়েছিলো এ এলাকার পুরুষরা। ধর্মীয় কারণ কিংবা প্রাকৃতিক কারণ যাই হোকনাকেন এখানকার নারীরা সে তুলনায় ঘরকোণা। পুরুষগণ দেশে বিদেশে বিবাহ করার প্রবণতা থাকলেও মেয়ে বিয়ে দেয়ার সময় তারা যতো সম্ভব কাছাকাছি দেয়ার চেস্টা করতেন।

ধর্ম এখানকার মানুষের জীবনকে শুরু থেকেই প্রভাবিত করেছে গভীরভাবে। সেই ধর্মান্ধ যুগ থেকে আজকের ধর্মসচেতন যুগ সবসময়ই। একসময় ধর্মীয় শিক্ষা ও ধর্মের মূল না জেনেও এখানকার লোকেরা ধর্মকে আকড়ে রেখেছিলো। পরবর্তীতে পীর ফকির দরবেশ মোল্লাদের মাধ্যমে ধর্মীয় শিক্ষার প্রসার ঘটলে এ অঞ্চলের মানুষরা তা সবার আগে গ্রহণ করে। একসময় সারাদেশে মসজিদ মাদ্রাসা এবং ধর্মীয় নেতার ভূমিকার এই অঞ্চলের লোকদের প্রাধান্য ছিলো। সম্ববত ধর্মের প্রতি আর্কষণ এবং প্রবাস প্রবণতা এদের একাজের সুযোগ করে দিয়েছে। মুসলিমদের আকীদাগত উন্নয়নের কারণে দেশের অন্যান্য অঞ্ছলের মানুষদের মতো ধর্মীয় গোড়ামী এখানে এখন সেরকম নেই। ধর্মীয় স্বাধীন চিন্তা এখানে বিকাশ লাভ করায় ধর্মীয় সম্প্রীতিতে হিন্দু ও খ্রিস্টানদের সাথে সদ্ভাব রক্ষায় দেশের অনেক অঞ্চল থেকে এরা এগিয়ে।
গান, গীত, কাব্য, ছড়া, খেলা কোনেটিতেই এখানে কোনো কমতি ছিলনা। কোনোকালে । ফসলের মাঠে ধান লাগাতে কৃষকদের লম্বা লম্বা বোল আর লোকজ গানের মোহনসুর প্রকৃতির সাথে তাদের নিবিড় বন্ধনের কথা কেবল মনে করিয়ে দেয়। বাড়িতে বাড়িতে পুঁথিপাঠ, কবিতার আসর,গল্পের বৈঠক, গীতিকার আয়োজন আর পালাগানের উৎসব এখনো অনেকের কাছে জীবন্ত স্মৃতি। সাধারণত যেসব ক্ষেত্রে এখানে গীতি চর্চা হতো সেগুলো হলো গীতিকা, পালাগান, বিয়েরগান সমসাময়িক বিষয়ে কবিতা ইত্যাদি।
গীতি কবিতা চর্চা এখানকার সংস্কৃতির আরেকটি সমৃদ্ধ দিক। এর মধ্যে সাড়া জাগানো কোন ঘটনা ঘটলে চারণকবিগন সে ঘটনা নিয়ে কবিতা রচনা করে হাটে বাজারে বাজনা ও দলসহ গেয়ে বেড়াতেন। কখনো কখনো কোনো গ্রামে, বিয়েতে বা অবস্থাপন্ন কারো বাড়িতে গান গাওয়ার ও কবিতা শুনানোর দাওয়াতে যেতেন । গ্রামের নারীরা দরদ দিয়ে শুনতেন সেসব কবিতা। অনেক ঘটনা নিয়ে কবিতার কথা শোনা যায়। যেমন ক্ষুদরামের ফাঁসি, কারবালার ঘটনা, আবদুল কাদির জিলানির জীবন ইত্যাদি । আমি ব্যক্তিগত ভাবে ছোটবেলায় ইন্রিা গান্ধির কবিতা, মুনিরের ফাঁসির কবিতা কথা স্মরণ করতে পারি।
শতশত ছড়া ছড়িয়ে আছে পুরো নোয়াখালি জুড়ে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে খেলার বোল, রয়েছে শিশু কিশোর আওড়ানো ছড়া, রয়েছে ঘুম পাড়ানী গান, ধাঁধার ছড়া এবং বিশেষ ঘটনা ও পরিস্থিতির কারণে উদগত ছড়া ।
লোকজ খেলার ক্ষেত্রে এ অঞ্চলে প্রাচুর্য এবং বৈচিত্র দুটোই আছে। সন্দেহ নেই এসব আজো অল্পস্বল্প এদেশের শিশুকিশোরদের বিনোদন হয়ে টিকে আছে।
গীতিকা সমূহের এক বিশাল ভূবন ছিলো এ এলাকায়। যেগুলো সন্ধ্যায় শুরু হলে সারারাত শেষ হয়ে যেতো গাঁয়ের আবাল বৃদ্ধ বনিতা সকলেই শুনতো এসব লোক কথা। কানির কিচ্চা, বান্দরের কিচ্চা, দুই সতিনের কিচ্চা এসব স্মরণ করা যায়। এমন আরো অনেক ছিলো কলের গানের পরে কলের ফিতা টেপ আসলে বান্দরের জারি নামে এবং অন্যান্য নামে রেকর্ড বাজারে বের হয়। তখনি আসরের আবেদন নস্ট হয়ে যায় এবং অসংখ্য গীতিকা হারিয়ে যায় কালের অতলে। জারিগানের বেশ প্রসার লাভ করে এসময়টাতে। সিরাজ বয়াতি চৌমুহনি বাবুল রেডিও হাউজের সহায়তার জারিগান ও আঞ্চলিক গানের একটা ভান্ডার গড়ে ওঠে। তবে নোয়াখালির প্রথাগত আঞ্চলিক গানের প্রসার ঘটে চট্টগ্রাম রেডিওর মাধ্যমে। মোহাম্মদ হাশেম সর্বপ্রথম নোয়াখালির আঞ্চলিক গান রেডিওতে গেয়ে খ্যাতি অর্জণ করেন এবং সারাদেশে এসব গানের ব্যাপক প্রসার ঘটান
মেলা সংস্কৃতি নোয়াখালী অঞ্ছলের আরেক সমৃদ্ধ আয়োজন। এখনো বৃহত্তর নোয়াখালীতে বেশ কয়েকটি মেলা বসে। এটা এখানকার হাজারবছরের ঐতিহ্য এসব মেলা বেশিরভাগই মাঝারকেন্দ্রীক। নলদিয়া মেলা ফেণী, আমতলী মেলা নোয়াখালী এমন আরো অনেক মেলা রয়েছে। মেলাকে ঘিরে এসব অঞ্চলের কৃষ্টি কালচারের একটা প্রবণতা দেখা দেয়। দূরদূরান্ত থেকে ব্যবসায়ীরা এসে পসরা সাজায় এসব মেলায়। আর স্থানীয় লোকজন কেনাকাটা সারে। যদি নলদিয়া মেলার উদাহরণ দিয়ে বলি তাহলে বলা যায় এখানে কি না পাওয়া যায়। খেলনা কসমেটিক্স, ফলফলাদি, দেশীয় খাবার, শীতের পিঠা , মাটির হাড়ি, কাঠ বেত লোহার আসবাব থেকে শুরু মাছ তরকারী হোটেল এমনটি সেলুন ও লন্ড্রী দোকান পর্যন্ত বসে এ মেলায়। শুধু কি কেনাকাটায় বিনোদনের ষোলকলা আয়োজন থাকে এতে । নাগরদোলা, পুতুল নাচ, বায়োস্কোপ, বোটিং, মোটর রেইস, যাত্রা, সার্কাস, নাচ-গান, আরো অনেক কিছুই।

নানা প্রবাদ- প্রবচন আর ধাঁধার জীবনমূখি চরিত্র এখানকার লোকসাহিত্যকে অনন্য উচ্চতায় ধরে রেখেছে। নাগরিক সংস্কৃতিতে দেশের অন্যান্য এলাকার তুলনায় এ এলাকাটি বেশ পিছিয়ে। এখানে থিয়েটার ও শিল্পগোষ্ঠির চর্চা খুবই কম এবং অত্যন্ত দূর্বল। আর একারনেই এখানকার লোকসাহিত্য সমৃদ্ধ হওয়া সত্বেও তা ক্রমশ আড়ালে চলে যাচ্ছে। নতুনভাবে এসব সংস্কৃতিকে নতুন মাধ্যমে তুলে ধরার মতো কোন ব্যক্তি, কর্মী প্রতিষ্ঠান কিছুই নেই। খুবই স্বল্প পরিসরে কিছু কাজ হয়। যা উল্লেখ করার মতো কিছু নয়।

Published : সেপ্টেম্বর ৮, ২০১৬ | 2273 Views

  • img1

  • সেপ্টেম্বর ২০১৬
    সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
    « আগষ্ট   অক্টোবর »
     
    ১০১১
    ১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
    ১৯২০২১২২২৩২৪২৫
    ২৬২৭২৮২৯৩০  
  • Helpline

    +880 1709962798