পুঁজিবাদের আগ্রাসন

Published : আগস্ট ১৪, ২০১৬ | 1664 Views

শাহিন আলম

পুঁজিবাদের আগ্রাসন

শাহিন আলম

 

আমাদের ছোটবেলায় ‘টাইগার ব্র্যান্ড গুঁড়া মসলা’ নামে একটা মসলা পাওয়া যেত। মা-খালাদের কাছে খুব জনপ্রিয় ছিল এই মশলা। এখনকার রাঁধুনি, প্রাণ, এসিআই, ডেকো, ইত্যাদি নামকরা গ্রূপের বাহারি ঝলমলে প্যাকেটের গুঁড়া মসলার ভিড়ে হারিয়ে গেছে সেই কাগজের প্যাকেটের টাইগার ব্র্যান্ড। এই টাইগার কোম্পানির মালিককে আমি চিনি না। তবে যখনই তার চেহারা টা কল্পনা করতাম কেন জানিনা, পাঞ্জাবি-পায়জামা-টুপি পরিহিত পান চিবানো চোখে সুরমা দেওয়া পুরোনো ঢাকার একজন টিপিক্যাল দিলদরিয়া বনেদি ভদ্রলোকের চেহারা ভেসে উঠতো। সেই ভদ্রলোক হয়তো শুরু করেছিলেন সামান্য একটা মসলা ভাঙানোর কল থেকে। নিশ্চিন্তমনে ভালোই চালাচ্ছিলেন ব্যবসা। কোনোদিন কি তিনি ভাবতে পেরেছিলেন এই সব বড় বড় সফিস্টিকেটেড ওষুধ কোম্পানি সামান্য গুঁড়া মসলার ব্যবসায় নেমে তার ব্যবসায় কোনো সিগন্যাল ছাড়াই লালবাত্তি জ্বালিয়ে দিবে ? না ভাবেন নি। কিন্তু তাই হয়েছে।

u201_246092_775170

আপনি হয়তো বলবেন, এটাই ব্যবসা। ব্যবসা মানেই প্রতিযোগিতা। উনি টিকতে পারেন নাই। তাই আউট হয়ে গেছেন। হয়তো ঠিক বলছেন। কিন্তু ভেবে দেখুন ভদ্রলোক কিন্তু আসলে মার খেয়ে গেছেন পুঁজির শক্তির কাছে। পুঁজিবাদ পড়া নাই, বুঝি কম। তবে ইদানিং পুঁজির জোড়টা বেশ ভালো মতো দেখতে এবং বুঝতে পারছি। ‘স্বপ্ন’ নামক চেইন স্টোরটা অচিরেই যে এদেশ থেকে মুদি দোকানের ব্যবসা বন্ধ করে দিবে- তা কি আপনি বুঝতে পারছেন? আচ্ছা, ধরি ইস্পাহানি এখন হঠাৎ ডিসিশন নিলো সারা দেশ ব্যাপী ‘টং’ এর দোকান এর একটা চেইন তৈরী করবে। থামানো যাবে? না। তাদের যা পুঁজি ও ডিস্ট্রিবিউশন চ্যানেল – খুব সহজেই এই ব্যবসা দাঁড়িয়ে যাবে। যারা টং এর দোকানে চা বেচে বেঁচে আছে তখন তাদের কি হবে ? কিংবা ধরি বসুন্ধরা সিদ্ধান্ত নিলো – আসন্ন কোরবানি ঈদে গরুর হাটগুলোতে তারা ১ লক্ষ গরু বিক্রয় করবে। গরু বাণিজ্যের পুরো কন্ট্রোল কি তখন তাদের হাতে চলে যাবে না? শেয়ার বাজারে একটা সার্কিট ব্রেকার থাকে।

 

একদিনে শেয়ার এর দাম একটা নির্দিষ্ট পার্সেন্টেজের বেশী বাড়তে কিংবা কমতে পারবে না। কর্পোরেটগুলোর ইনভেস্টেমেন্টের ক্ষেত্রেও এরকম একটা ‘সার্কিট ব্রেকার’ এর মতো কিছু থাকলে ভালো হতো। নতুন ইনভেস্টমেন্ট করতে হলে বাপু Higher Tech এ করো। বেছে বেছে দূর্বল প্রতিপক্ষের সাথে খেলা কেন ? পুঁজি আছে বলেই একটা মোবাইল কোম্পানি হুট্ করে আটা-ময়দা বেচার ব্যবসায় নামতে পারবে না, নামতে হলে স্যাটেলাইট ব্যবসায় নামো। সিনেমা প্রোডিউসার নাটক বানাতে পারবে না। গুঁড়া মসলার কোম্পানি যদি ওষুধ বানাতে চায় মোস্ট ওয়েলকাম। কিন্তু ওষুধ কোম্পানির গুঁড়া মসলা বানানো উচিত না। বাই সাইকেল কোম্পানি মোটর সাইকেল বানাক, মোটর সাইকেল থেকে গাড়ি, তারপর গাড়ি থেকে প্লেন। গার্মেন্টস থেকে টেক্সটাইল মিল। গার্মেন্টস থেকে মাছের খামার নয়। মাছের খামার করুক সদ্য মাস্টার্স করা তরুণ কয়েকজন উদ্যোক্তা মিলে। গুঁড়া মসলা/ প্যাকেটজাত আটা -ময়দা -সুজির ব্যবসা দিয়ে শুরু হোক এদের উদ্যোগী জীবন।

এটা না করা গেলে দুনিয়া থেকে নতুন উদ্যোক্তাদের অস্তিত্ব তো বিলীন হয়ে যাবে। এমনিতেই এখন সবাই পাস করেই চাকরী খোঁজে। কেউ উদ্যোক্তা হতে চায় না। বড় কোম্পানির সাথে ফাইট করার মতো পুঁজি এরা কোথায় পাবে? ব্যাংক তো এদেরকে লোন দেয় না। কথায় বলে – A Bank provides you loan only when you can successfully prove that you don’t need it. লোন চাইলে এটা দেখাও -ওটা দেখাও -এই দাও -ওই দাও। আরে বাবা, এতো কিছু যদি থাকতো তাহলে তোর কাছে ধার চাইতে আসবো কেন ? এমনকি, উদ্যোক্তা শুনলে কেউ মেয়ে পর্যন্ত বিয়ে দিতে চায় না। এভাবেই বড়ো বড়ো কর্পোরেটওয়ালারা সব ব্যবসা দখল করে নিয়ে নতুন উদ্যোক্তা নির্মূল করে তাদের পুত্র কন্যাদের জন্য নিষ্কন্টক ব্যবসার পরিবেশ নিশ্চিত করে যাচ্ছে।

পুঁজির শক্তির কথা বলছিলাম না? দুনিয়ার সবচেয়ে বড় কোম্পানি ‘ওয়ালমার্ট’ । এই ‘ওয়ালমার্ট’ যদি একটা দেশ হতো জিডিপি অনুসারে এটা হতো বিশ্বের ২৫ তম অর্থনৈতিক শক্তির দেশ। Yahoo দেশ হলে তা হতো মঙ্গোলিয়ার চেয়ে বড়। Visa বড় জিম্বাবুয়ের চেয়েও। প্যারাগুয়ের চেয়ে Nike বড়। Pepsi র সাইজ ওমান এর চেয়েও বড়। General Motor এর GDP বড় হত আমাদের বাংলাদেশ এর চেয়েও। ‘ওয়ালমার্ট’ যদি এখন ২৫ তম হয়, এর ১ম হতে আর কতদিন লাগবে ? ১০ বছর ? ১৫ বছর ? ২০ বছর ??!! তখন কি হবে ? আমার কেন জানি মনে হয় – দেশ কনসেপ্টটাই তখন আর থাকবে না। দুনিয়াটা ভাগ হয়ে যাবে বড়ো বড়ো কর্পোরেশনগুলোর কাছে। তখন পরাশক্তি বলতে আমেরিকা আর রাশিয়া বুঝবো না, Walmart আর Exxon Mobil কে বুঝবো। তখন আর ইরাক-ইরান যুদ্ধ হবে না। যুদ্ধ হবে Microsoft আর Samsung এর মাঝে। কোম্পানির শাসনে আবার আমাদের কৃষককে নামতে হবে নীল-চাষে। মানুষগুলো সব আবার পরিণত হবে ক্রীতদাসে। বালাই শাঠ, এমন যেন না হয়।

Published : আগস্ট ১৪, ২০১৬ | 1664 Views

  • img1

  • Helpline

    +880 1709962798