মুভি রিভিউ: বেদের মেয়ে জোসনা

Published : আগস্ট ১২, ২০১৬ | 3948 Views

মনে পড়ে বেদের মেয়ে জোসনার স্মৃতি

জাহাঙ্গীর আলম শোভন

১৯৮৯ সালে মুক্তি পায় তোজাম্মেল হক বকুল পরিচালিত পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা ছায়াছবি ‘বেদের মেয়ে জোসনা’। সে সূত্রে এ বছর ২০১৩ সালে ছবিটির দুইযুগ পূর্তি হয়েছে। এটি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সবচেয়ে জনপ্রিয় ছবি। লোকজ গল্পনির্ভর এ মুভিটি তখনকার সময়ে গ্রামে গঞ্জে সর্বত্র এক কঠিন আলোড়ন তৈরী করেছিলো। দলে দলে মহিলারা পরিবারের সবাই মিলে ধনী গরিবের রাজারপুত্র আর দরিদ্র বেদেকন্যার প্রেমকাহিনীর ছবিটি দেখতে মাসের পর মাস সিনেমা হলে ভীড় করেছিলো।

বেদের মেয়ে জোসনার সাফল্যের পিছনে অনেক কারণ ছিলো। সে সময়ের জনপ্রিয় জুটি ইলিয়াছ কাঞ্চন ও অঞ্জু ঘোষ এতে অভিনয় করেন। দু’জনের অভিনয় নিয়ে কোন কিছু বলার ছিলনা আর চরিত্র ফুটিয়ে তোলার ক্ষেত্রেও তারা উত্রে গেছেন ভালো ভাবেই। একটি বাণিজ্যিক ছবির অন্যান্য মাল মসলার সাথে ছিলো কৌতুক অভিনেতা দিলদারের ঊপস্থিতি আর মন্দলোক চরিত্রে নাসির খানের অভিনয়। সবচেয়ে বড় যে কথা, সেটি হলো- এটি একটি লোকজ গল্প নির্ভর ছবি। লোকজ গল্পের সেই ছোটবেলায় হারিয়ে যাওয়া কন্যা বেদের গৃহে মানুষ হওয়া এবং রাজকুমারের প্রেমে পড়া অবশেষে রাজশক্তির সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়া সবই দর্শককে চুম্বকের মতো করে টেনেছে।

নায়িকা চরিত্রের সুন্দরী লাস্যময়ী সুনয়না অঞ্জু ঘোষের লোক সংস্কৃতি তথা যাত্রার একটি ব্যাকগ্রাউন্ড ছিলো আর প্রতিবাদী জোসনা চরিত্রে রাজার মুখোমুখি হয়ে নিজের অধিকারের কথা বলতে দেখে দর্শক আনন্দে উদ্বেলিত হয়েছে। জোসনা হয়ে গেছে সমাজের সেই খেটে খাওয়া মানুষদের প্রতিনিধি, তাদেরই আপনজন। রাজা চরিত্রে বরাবরের মতোই লা জবাব ছিলেন দরাজকন্ঠের শওকত আকবর। অন্যান্য পাশ্বচরিত্রগুলোকেও দর্শক আপন করে নিয়েছে। যেমন দাদী চরিত্রে রওশন জামিল। অন্যান্য পাশ্বচরিত্রে মিঠুন, সদ্যপ্রয়াত কবিতা ও প্রবীরমিত্র।

তখন সময়টা এমন ছিলো- লোকজ গল্পের দিন এর আগে খুব রমরমা ছিলো। গ্রামীণ পটভূমিতে তৈরী ছবি তখন ভালো সময় কাটাচ্ছিলো আর ভারতীয় সিনোমর দেখাদেখি শহুরে জীবন কিংবা শহুরে ও গ্রাম্য জীবনের মিশ্রণে তৈরি ছবিও ভালো কাটছিলো। এরই মধ্যে এলো বেদের মেয়ে জোসনা। লোকজ গল্পের একবারে হিট ছবির তালিকায় এরপরে আর খুব বেশি ছবি ছিলনা। অবশ্য আগে নির্মিত যাত্রাপালার সিনেমা ভার্সন যেমন রহিম-রূপবান, গুনাইবিবি, অরুণ বরুণ কিরণমালা এসব বেদের জোসনার আগের ছবি। আর গ্রামীণ পটভূমিতে নির্মিত খান আতাউর রহমান ‘সুজনসখি’র কথা না বললেই নয়। অবশ্য গ্রামীণ পটভূমিতে নির্মিত অনেক ছবিই এরপরেও দর্শক দেখতে পেরেছিল।

বেদের মেয়ে জোসনার আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিলো এর মূল থিম ছিলো পল্লীকবি জসীম উদদীনের ‘বেদের মেয়ে’ থেকে নেয়া। এ গ্রন্থের প্রথম সংস্করণ বেরিয়েছিলো ১৯৫১ সালে কলকাতা প্রেসিডেন্সি লাইব্রেরী থেকে ৭৪ টি পৃষ্ঠায়। ১৯৬৩ সালে ঢাকার আদিল ব্রাদার্স বের করে এই বইয়ের ২য় সংস্করণ। কবির একজন বন্ধু জনৈক পাটোয়ারী সাহেব চাঁদপুর জেলার মতলবে বেদেদের নিয়ে একটি কনফারেন্স এর আয়োজন করেন। এ উপলক্ষে কবি বেদের মেয়ে চম্পার ট্রাজিক উপাখ্যান নিয়ে এটি রচনা করেন। গ্রাম্য মোড়ল ও তার বিপরীতে প্রতিবাদী বেদেকন্যা চম্পার উপাখ্যানটি তখন এই দেশের অবহেলিত মানুষের প্রতিভূ হয়ে ফুটে উঠেছে। মূল গল্পের সাথে যদিও মিল কম তবুও মূল বক্তব্য একই। ছবিতে জোসনার ছোটবেলার বিষয়টি রূপকথার গল্পের সাথে মিলে যায়, বেদের মেয়ে চম্পাকে বানানো হলো জোসনা এবং ছবিতে মূল প্রতিপাদ্য ধনী গরিবের বৈষম্য দেখাতে গিয়ে প্রেমটাকে মূখ্য করে দেখানো হয়েছে।

অনেকের মতে অহংকারী রাজার সামনে জোসনার প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর তখনকার এরশাদবিরোধী আন্দোলনের জনগণের একাত্মতার কারণে মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে এ ছবির গল্প সংলাপ ও গান। সাদা-কালো ও আংশিক রঙীন ফরম্যাটে নির্মিত ছবির গানের মূল আকর্ষণ ছিলো লোকজ সুর লোকজ অনুভূতি ও অভিব্যক্তি।

‘বেদের মেয়ে জোসনা আমায় কথা দিয়েছে,
আসি আসি বলে জোসনা ফাঁকি দিয়েছে।
আমি যখন রাঁধতে বসি বন্ধু বাজাও বাঁশি,
রান্না বাড়া রেখে আমি কেমন করে আসি।
দাদা আর দাদিরে আমি কি দিয়ে বুঝাই,
কাঁখের কলসি লইয়া আমি প্রেম যমুনায় যাই’
– গানটি তখন হাট-বাজার সর্বত্র মানুষের মুখে মুখে ছিলো।

লোকজ শিল্পী মুজিব পরদেশীর একটা গান ছবিতে সংযোজিত ছিলো-
‘আমি বন্দী কারাগারে, আছি গো মা বিপদে,
বাইরের আলো চোখে পড়েনা।
জেলখানার সম্বল, থালা বাটি কম্বল
এছাড়া অন্য কিছু মিলেনা।’
লোকগানের জন্যও নির্মাতাকে আবার জসীম উদদীনের কাছে আসতে হয়েছে।

কবির পদ্মপার গীতি সংকলন থেকে একটি গানকে খানিক পরিবর্তন করে ছবিতে ব্যবহার করা হয়েছে। মূল গান ছিলো-
‘বাবু সেলাম বারে বার,
নামটি আমার গয়াবাইদ্যা
বাবু থাকি পদ্মারপার।’
পরিবর্তিত রূপ-
‘ও রানি সালাম বারে বার,
নামটি আমার জোসনা বানু
রানী থাকি লক্ষার পার।
……………………………..
মোরা একঘাটেতে রান্ধি বারি
আরেক ঘাটে খাই,
মোদের সুখের সীমা নাই।
পথে ঘাটে লোক জমাইয়া
মোরা সাপ খেলা দেখাই।’

লোকসাহিত্যের আরো একটু ছোঁয়া ছিলো এ ছবিতে। যাত্রায় যেমন বিবেকের গান থাকে সেরকম একটি পরিবেশনা ছিলো-
‘ও তুই ভাবলি যারে আপন করে,
সেতো অসহায়,
মনের মানুষ কেঁদে কেঁদে যায়।’

লোকসাহিত্যের নির্ভরতা, ধনী গরিবের ব্যবধান, নিখাঁদ প্রেম, প্রতিবাদী গ্রাম্য রমণীর জেগে ওঠা সব মিলিয়ে সময়ের একটি বার্তা বেদের মেয়ে জোসনাকে একটি শক্ত আসন পেতে দিয়েছিলো। শিল্প, যৌক্তিকতা ও বাস্তবতার বিচার বাদ দিলে একটি লোকজ গল্পের ব্যবসায়িক ছবি হিসেবে বেদের মেয়ে জোসনা তার জায়গায় মজবুত ভিত্তির উপর দাঁড়িয়েছিলো। দর্শকপ্রিয়তা, বিশেষ করে সে দর্শক যারা একেবারে আপামর জনগণ তারা জোসনাকে তাদের একজন ভাবতে পেরেছে সম্ভবত এখানেই বেদের মেয়ে জোসনার আসল স্বার্থকতা ।

এরশাদের পতন হয়েছে তার দুই বছর পরে। বেদের মেয়ে জোসনা দীর্ঘদিন টপলিস্টে থেকে প্রযোজকের পকেট ভারী করেছিলো। যে বেদের মেয়ে প্রতিবাদী হয়েছিলো সে বেদের মেয়েদের গত দুই যুগে কোন ভাগ্যবদল হয়নি। রয়েছে আগের মতোই বরং ছবিতে যে বেদের মেয়ে নিজের অধিকার আদায়ে বজ্রকণ্ঠ হয়েছিলো সে বেদের মেয়ে আজ নিজেদের ব্যুহ থেকেও বের হতে পারেনি। যে জোসনারা অসীম সুখে পদ্মাপারে বসে সাপ খেলা দেখাতো সে জোসনাই আজ ঢাকার রাস্তায় সাপের ভয় দেখিয়ে আতংকিত পথিকের পকেট খসাচ্ছে। তেমনি করে ক্ষমতার পালাবদলে যে সাধারণ মানুষেরা স্বপ্ন দেখেছিলো নতুন দিনের তাদের সে স্বপ্ন সে তিমিরেই রয়ে গেল। আর নিজেদের দিন ফেরাতে মানুষরা কি না করছে।

IwPdo11

Published : আগস্ট ১২, ২০১৬ | 3948 Views

  • img1

  • Helpline

    +880 1709962798