ইবনে বতুতার সফরের জানা অজানা দিক

Published : মে ২৭, ২০১৮ | 815 Views

শোভন

বিশ্বজয়ী পর্যটক ইবনে বতুতা সম্পর্কে ১০টি জানা ও অজানা কথা
জাহাঙ্গীর আলম শোভন
আজ থেকে ৭শ বছর আগে সেই সুদূর মরক্কোর তাঞ্জিয়ের থেকে পৃথিবী দেখার নেশায় ঘর ছেড়েছিলেন। বছর বিশের কোটার যুবক ইবনে বতুতা। তারপর মধ্যপ্রাচ্য ইরাক, ইরান, বসরা, সিরিয়া, ফিলিস্তিন, পাকিস্তান, ভারত শ্রীলংকা মালদ্বীপ ঘুরে এসেছিলেন এই বাংলায়। জন্ম ১৩০৪ খ্রিষ্টাব্দ। ৩০ বছরে তিনি ভ্রমণ করেছেন ৭৫ হাজার মাইল বা ১ লাখ ২১ হাজার কিলোমিটার পথ। তার পুরো নাম আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ। ভারতে তিনি ভিন্ন নাম নিয়েছিলেন।

মালিকি মাজহাবের একজন ধর্মতাত্বিক ছিলেন তিনি। তিনি মোট ৪০টি দেশ ভ্রমণ করেন এবং ৭বার পবিত্র হজ্জ পালন করেন। যাত্রার সূচনা হয় ১৩২৫ সালের ১৪ জুন নিজ শহর থেকে। ১৩৫৪ সালের শুরুর দিকে তার জন্মভূমিতে শেষবারের মত পদার্পন করেন। মরক্কোর ফেজে তিনি শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন। সাল ১৩৭৭।
তিনি ভ্রমণ করেছেন এদিকে চীন আর ওদিকে আফ্রিকা পর্যন্ত। তার ভ্রমণ কাহিনী বিশ্ব সভ্যতার এক মূল্যবান সম্পদ। সারা পৃথিবীতে যেসব দেশ তিনি ভ্রমণ করেছেন সেসব দেশের ইতিহাসের তথ্য আজো ইবনে বতুতার তরীকত ই নসিরি (নামটা পুরো মনে নেই) গন্থ থেকে নেয়া হয়।

এমন আমাদের এই বাংলাদেশ। এখানে চট্টগ্রাম, সোনার গাঁ আর সিলেট ভ্রমণের পুঙ্খানু বিবরণ রয়েছে তার ভ্রমণ কাহিনীতে। তিনি লিখেছেন এখানে যেমন সম্পদের প্রাচুর্য জিনিসপত্রের কম মূল্য তিনি পৃথিবীর কোথাও দেখেন নি। এগুলো পুরনো খবর। ইবনে বতুতার ভ্রমণকাহিনী পড়ে নতুন যে বিষয়গুলো জেনেছি বা জেনে অবাক হয়েছি সেগুলো হলো-

১. হযরত শাহজালার (র) এর সাথে তার সাক্ষাত ও জামা সংক্রান্ত অলৌকিক ঘটনাটি। এছাড়া বিভিন্ন দেশে সাধু, দরবেশ, পীর ও সন্যাসীদের নানা অলৌকিক ক্ষমতার বিষয়টি আমাকে অবাক করেছে। কিছু কিছু ঘটনা তিনি নিজে চাক্ষুস করেছেন।

২. আমার কল্পনায় ছিলো তিনি একা একা পথ চলেছেন। কিন্তু বই পড়ে জানলাম। বেশীরভাগ সময়ে তার সাথে কাফেলা ছিলো। তিনি নিজে একজন জ্ঞানী মানুষ ছিলেন, তার পূর্বপুরুষগণ কাজীর পেশায় ছিলেন ফলে তিনি যে দেশে গিয়েছেন সেখানেই রাস্টীয় অতিথির মর্যাদায় অভিসিক্ত হয়েছেন। কাজীর চাকরী করেছেন, মন্ত্রীর মেয়ের পানী গ্রহণ করেছেন। রাস্ট্রদূত কখনো কখনো সেনাকমান্ড এর দায়িত্ব পেয়েছেন। সাহস, বিচক্ষনতা ও সততার জন্য রাজনগণ তাকে বিশেষ পছন্দ করতেন। তার সাথে দাসদাসী ও কখনো কখনো সরকারী লোকজন কিংবা ব্যবসায়ীরা ছিলেন।

৩. দিল্লীতে তিনি দীর্ঘ ৭ বছর কাজীর দায়িত্ব পালন করেছেন। মালদ্বীপেও করেছেন কয়েকবছর। মালদ্বীপ সম্পর্কে তিনি লিখেছেন তিনি কাজী হয়ে হুকুম জারি করেও সেখানকার নারীদের বক্ষে কোনো কাপড় দ্বারা আচ্চাদিত করতে পারেননি। তারা শুধু নিন্মাঙ্গে পোষাক পরতো। তারা মুসলিম ছিলো। নামায পড়তো অনেক নিয়মই মানতো। এবং তখন কোনো বিদেশী রাজা মালদ্বীপ আক্রমণ করতোনা। যারাই করতো তারা কিছুদিনের মধ্যে ভয়ানক সমস্যা, অসুখ কিংবা বিপদে পড়তো। তাই মালদ্বীপের লোকজন নিরীহ সত্বেও নিরাপদ ছিলো।

৪. সমৃদ্ধ সোনার গাঁ সম্পর্কে তিনি অনেক কথাই লিখেছেন। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণহলো এখান থেকে সারা পৃথিবীর উদ্দেশ্যে পালতোলা জাহাজ ছেড়ে যেত। তের শতাব্দীর কথা। তিনি ইন্দোনেশিয়ায় যাওয়ার জন্য এখানে জাহাজে চড়ে বসেছিলেন।

৫. ইবনে বতুতাকে বিভিন্ন দেশের রাজা, রানী ও মন্ত্রীগণ, জাহাজ ভর্তি উপহার, শত শত ঘোড়া, উট এবং অসংখ্য দাসদাসী উপহার দিয়েছেন। তিনি নিজেও বিভিন্ন দেশে দাসদাসী কিনেছেন। বাংলায় এসে হাবসা নামে এক দাসী কিনেন মাত্র আড়াই দিরহামে। তার চলতি পথেই দাসীদের কেউ কেউ মা হয়েছেন। কেই মারা গেছে, কেউ লুট হয়েছে অন্যান্য মালের সাথে।

৬, চীনে সংস্কৃতি ও রাস্ট্রযন্ত্র সংগঠিত হলেও সেখানে অসভ্যতা ছিলো। ইতরামি ছিলো ভারত মহাসাগরের কিছু দ্বীপে এবং আফ্রিকায়। বিশ্বের মানুষ বতুতার তথ্য গ্রহণ করে তার তথ্যের সততার কারণে। তিনি একজন ফরহেজগার মুসলিম ছিলেন। তিনি যেমন মহান মুসলিম নৃপতীদের গুনগান করেছেন তেমনি অত্যাচারি মুসলিম নৃপতীদের বর্বরতার কথাও লিখেছেন। ঠিক অন্যদের বেলায়ও তাই করেছেন।

৭. বাংলার সুলতান তখন ফখর উদ্দীন মোবারক শাহ, তিনি তার সাক্ষাত লাভ করেছেন। তার প্রশংসাই করেছিলেন। এবং হযরত শাহ জালাল বা জালালুদ্দিন সম্পর্কে বিস্তারিত লিখেন। তিনি বিভিন্ন দেশের জ্ঞানী-গুনী মানুষদের সাথে দেখা করতেন। তেমনি তিনি শাহজালাল (র) এর সাথে দেখা করেছেন।

৮. যখনি কোনো বিষয়ে তিনি সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতের তখন তিনি অযু করে কোরআনের একটি পাতা খুলে দেখতেন। সে পাতায় তার চোখে যে আয়াতটি পড়তো তিনি সে আয়াতের অর্থবুঝে সিদ্ধান্ত নিতেন তিনি কোনপথে যাবেন।

৯. তিনি লিখেন বাংলায় মাত্র এক দিরহাম দিয়ে তখন বাংলাদেশ আটটি স্বাস্থবান মুরগী পাওয়া যেত, এছাড়াও এক দিরহামে পনেরোটা কবুতর, দুই দিরহামে একটি ভেড়া এবং এক স্বর্নমূদ্রারও কম মূল্যে দাসদাসী কিনতে পাওয়া যেত।

১০. নিরাপত্তা ও অন্যান্য বিশেষ প্রয়োজনে তিনি কখনো কখনো পরিচয় গোপন করেছেন। এবং কূটনৈতিক কারনে ভিন্ন নামও ব্যবহার করেছেন। চীনে তার নাম ছিলো শামসুদ্দিন এবং ভারতে তার নাম ছিলো মাওলানা বদর উদ্দীন।

মরুভূমির তপ্তবালিতে উটের পিঠে চড়া, সমুদ্রে অনেকবার জাহাজডুবি, ভিনদেশের সৈন্যদলের দ্বারা আক্রমণ, লুটেরার কবলে পড়া কিংবা রাজা বাদশাহদের বিরাগভাজন হওয়া এগুলো ছিলো তার সফরের অংশ তাই সেগুলো আলাদা করে লিখলামনা। আর বিভিন্নসময় বিভিন্ন দেশের নানা অসুখ বিসুখতো আছেই। তার বর্ণনা থেকে জানা যায় তখন প্লেগের ব্যাপক প্রভাব ছিলো। কোনো কোনো শহরে দৈনিক ২০ হাজার লাশও দাফন করা হতো।

Published : মে ২৭, ২০১৮ | 815 Views

  • img1

  • মে ২০১৮
    সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
    « মার্চ   জুন »
     
    ১০১১১২১৩
    ১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
    ২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
    ২৮২৯৩০৩১  
  • Helpline

    +880 1709962798