ফেনীর ভিন্নরকম কিছু দর্শনীয় স্থান

Published : এপ্রিল ২০, ২০১৭ | 2313 Views

ফেনীর ভিন্নরকম কিছু দর্শনীয় স্থান

ফেনী জেলার প্রধান দর্শনীয় স্থানের মধ্যে রয়েছে মুহুরী সেচ প্রকল্প, বিজয়সিংহ দিঘী, পাগলা মিয়ার তাকিয়া, লালদিঘী শিশু পার্ক, ভাষাশহীদ সালামের জন্মভিটা, চম্পকনগর শমসের গাজীর স্মৃতিচিহ্ন, শিলুয়ার শিল পাথর, শমসের গাজীর সুড়ঙ্গ,  নলদিয়া দরগাহ ও মেলা ইত্যাদি। এছাড়া আরো কিছু দর্শনীয় স্থান রয়েছে ফেণীতে। সেসব দর্শনীয় স্থান নিয়ে আজকের এই রচনা।

চাঁদগাজী মসজিদঃ

মোগল আমলে এই এলাকার একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি ছিলেন চাঁদগাজী ভূঞা। তার নামানুসারে ছাগলনাইয়া উপজেলা সদরের অদূরে চাঁদগাজী বাজার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। চাঁদগাজী বাজারের কাছে মাটিয়া গোধা গ্রামে অতীত ইতিহাসের সাক্ষী হিসাব অবস্থান করছে চাঁদগাজী ভূঞা মসজিদ। মধ্যযুগের রীতি অনুযায়ী চুন, সুডকী ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ইট দ্বারা তৈর করা এ মসজিদের দেয়ালগুলো বেশ চওড়া । মসজিদের ছাদের উপর তিনটি সুদৃশ্য গম্বুজ। মসজিদের সামনে একটি কালো পাথরের নামফলকে এ মসজিদের নির্মানকাল ১১১২ হিজরী সনউল্লিখিত আছে। তা থেকে সহজে বলা যায় যে, আজ থেকে তিনশ বছর আগে এই মসজিদ নির্মাণ করা হয়। এই অঞ্চলের অন্যতম পুরনো স্থাপনা।

ঢোল মন্দির

ফুলগাজীর দোলমন্দির

১২০০ বঙ্গাব্দ শেষ ১৩০০ বঙ্গাব্দ এর শুরুতে ফুলগাজী ত্রিপুরা সহ এ অঞ্চলে ছিল রাজা আহাম্মদ আলির রাজত্ব তাই তার নামে নামকরণ করে বাংলা ১৩০৫ সনের চৈত্য মাসে পূর্ন চন্দ্র চৌধুরী এ মন্দিরটি তৈরি করে এটি পরে সবার কাছে দোল মন্দির পরিচিতি পায়, মন্দিরের পাশে হতো দোল উৎসব বৈশাখ মাস জুড়ে হতো এখানে মেলা, উৎসব, নাচ গান সব,
এ মন্দিরের একটা ঐতিহ্য ছিল মন্দিরের শুরুঙ্গ পথ যা পাশের দীঘির সাথে সম্পৃক্ত সুড়ঙ্গ পথ
ফুলগাজীর এই ঐতিহ্যবাহী ঢোল মন্দিরকে ঘিরে রয়েছে শত বছর ইতিহাস ঐতিহ্য ও নানা আয়োজন। তবে কীর্তি নারায়ণ চৌধুরীর এই ঢোল মন্দিরে তৎকালীন ভারত হতেও আসতেন হিন্দুরা মহাদেব পুজো করতে। মানস করা হতো জীবিত ছাগল। ফেলে দিতেন মন্দিরের অন্ধকার গুহায় এরপর কি হতো, কোথায় যেত তা আর কেউ জানতেন না।
এখানে বলি দেওয়া হত যা পরে এ সুড়ঙ্গ পথে দিঘীতে ভেসে উঠতো।

অনেকের মতে, বিশ শতকেও  এই দোল মন্দিরে সতীদাহ  হতো। ফলে এখানে পরে আত্মহত্যার প্রবনতাও বেড়ে গিয়েছিল। সতিদাহ ও বলি বন্দ হলেও নানা কারণে মাঝে মধ্যে দিঘীতে লাশ পাওয়া যেত। ধারণা করা হতো এগুলো আত্মহত্যা অথবা হত্যাকান্ডঅ এসব কারণে ৭০ দশকের প্রথম সময়ের দিকে ঢোল মন্দিরের গভীরের সেই সুডঙ্গটি বন্ধ করে দেয়া হয়। বর্তমানে মন্দিরটি সংস্কার করার উদ্যোগ নিয়েছে জেলা প্রশাষন।

 

জগন্নাথবাড়ী কালি মন্দির:

ভাটির বীর খ্যাত যোদ্ধা শাসক এবং শিল্পরসিক সম্পন্ন অসাম্প্রদায়িক চেতনার পুরোধা শমসের গাজী তার বাল্যকালের লালন কর্তা জগন্নাথ সেনের স্মৃতিতে একটি মন্দির ও কালি মূর্তি নির্মাণ করেন। শমসের গাজী ক্ষণজন্মা এক প্রভাবশালী বাঙালী শাসক যিনি ত্রিপুরা অধিকার করেছিলেন। এবং ব্রিটিশ শাষন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কিছুকাল সময় পর্যন্ত তার রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন। পরে ত্রিপুরার রজার ষড়যন্ত্রে তিনি রাজ্য হারা হন ও তাকে হত্যা করা হয়। তার জীবেনের ইতিহাসে অত্যন্ত চমকপ্রদ।জগন্নাথ মূর্তির দর্শনীয় বিষয় হচ্ছে, এর দুইনেত্র প্রকোষ্ঠে বসানো লাল বর্ণের পাথর। অন্ধকারে পাথরগুলো আলো বিকিরণ করে। প্রতিদিন দুর-দুরান্ত থেকে দর্শনার্থীরা এটি দেখতে আসেন।


বাউরখুমা আশ্রয়ন প্রকল্প, পরশুরাম

বাউর খুমা আশ্রয়ন প্রকল্পে সরকারী জমিতে ভূমিহীনদের আশ্রয় দেয়ার একটি প্রকল্প। এই প্রকল্পের মোট ব্যারাক সংখ্যাঃ ৬০টি। ৬০টি ব্যারাকে  ৬০টি পরিবারকে পূনবাসন করা হয়েছে। ঋনের আওতাভুক্ত করা হয়েছে সবাইকে। মোট জনসংখ্যা ৬২ জন, পুরুষঃ ৭৬, মহিলাঃ ৮৬জন। এটি একটি বাগান ছিলো যাতে বেশকিছু গাছপালা রয়েছে। হিসেব অনুযায়ী প্রায়  বৃক্ষঃ ২০০০টির মতো আজ জাম কাঠালও বিভিন্ন গাছ রয়েছে।  ফেনী থেকে CNG/বাস দিয়ে পরশুরাম, পরশুরাম থেকে CNG দিয়ে বাউর খুমা আশ্রয়ন প্রকল্পে যাওয়া যায়।


জমিদার বাড়ীর সাত মন্দির, ছাগলনাইয়া,

ছাগলনাইয়ায় ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য শিল্পের নিদর্শন হিসেবে সাত মন্দির ঘোষণা করছে নিজের অস্তিত্ব।ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া উপজেলার পশ্চিম ছাগলনাইয়া গ্রামে এটি অবস্থিত। নিজ চোখে না দেখলে উপলব্ধিকরা যাবেনা এর অপুর্ব সৌন্দর্য্য।ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনীতি যখন সংকটময় মুহুর্ত অতিক্রম করছে। যখন ম্যার জন শোরের পর লর্ড মনিংটন অর্থ্যাৎলর্ড ওলেয়েসলী গভর্ণর জেনারেল হয়ে ভারতে আগমন করেন, ঠিক তখনই ফ্রান্সের সাথে ইংল্যান্ড এক মহাযুদ্ধে লিপ্ত হয়।নেপোলিয়ন বোনাপার্টের দিগি¦জয় এবং তার ভারত বিজয়ের কল্পনায় ইংল্যান্ড সস্ত্রস্ত; ভারতের পেশোয়া, সিদ্ধিয়া, হোলকার ও নিজাম।

শিলুয়ার শীল পাথর

সাবেক রতননগর পরগনার একস্থানে উনিশ শতকের একটি শিলা দেখা যায়।এই শিলাটি প্রাচীন কীতিগুলোর মধ্যে অন্যতম।এই শিলা থেকে ঐ স্থানের নামকরণ হয় শিলুয়া। এটি ছাগলনাইয়া হতে ৫-৬ মাইল পশ্চিমে কন্ট্রাক্টর মসজিদ বাজার হতেপ্রায় ৩ কিঃমিঃ দক্ষিণে মধ্যম শিলুয়া চৌধুরীবাজারের ৫০ গজ পশ্চিমে ও শিলুয়া চৌধুরী বাড়ীর পূর্ব পার্শ্বেছায়াসুনিবিড় স্থানে শীলটি অবস্থিত । ঐ স্থানটির চার পাশে লোহার পিলার ও কাটা তার দিয়ে ঘেরাও দেওয়া। এই স্থানেবৃক্ষরাজি ছায়াচ্ছন্ন স্থানে দর্শনার্থীদের বসার জন্য দুটি বেঞ্চ আছে। পাথরটি ত্রকটি টিন ও কাঠের চৌচালা ঘরদিয়ে আচ্ছাদিত। ফেনী সদর হতে সিএনজি অটোরিক্সা এবং বাস যোগে দর্শনীয় স্থানে যাওয়া যায় ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া উপজেলায়।


চৌধুরী বাড়ী মসজিদ

বহু বছর আছে এলাকার সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবার বাড়ীর বহিরাঙ্গনে পূরুষ লোকদের জন্য একটি মসজিদ স্থাপন করেছিলেন, পরে এলাকায় মুসলিম বসতী বাড়ার পাশাপাশি মসজিদে সুমুল্লীর সংখ্যা বাড়ে। তখন চৌধুরী বাড়ীর মুরুব্বী যাকে গ্রামের সবাই মেনে চলতেন। তিনি মসজিদটির আরো বেশী উন্নয়নের লক্ষ্যে স্থানীয় গ্রামবাসীদের সম্পৃক্ত করে একটি কমিটি করেনি এবং বিদেশ থেকে অনুদান গ্রহন করে মসজিদ এর উন্নয়ন করেন। বর্তমানে এলাকার ঐতিহ্য ঘোষনা করছে এই মসজিদটি। চৌধুরী বাড়ি মসজিদ ফেনীর মহিপাল মোড় থেকে ফেনী-চৌমুহনী-নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়ক হয়ে প্রায় ১৭ কিলোমিটার দূরে রাস্তার ডান পাশে চৌধুরী বাড়ি মসজিদ। ৪ নং রামনগর ইউনিয়ন এলাকায় অবস্থিত।সুদৃশ্য এ মসজিদটি এ দাগনভূঞা উপজেলার ৪ নং রামনগর ইউনিয়নে অবস্থিত।
বিলোনিয়া স্থল বন্দর

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে ফেনী জেলার (তৎকালীন ফেনী মহুকুমার) স্বাধীনতাকামী জনগনের রয়েছে অভাবনীয় বীরত্বগাথা। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের সাথে তিন দিক থেকে ফেনীর রয়েছে সীমান্ত। ফলে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ফেনীতে ব্যাপক অত্যাচার নিপীড়ন চালায়। ফেনী সীমান্তে মুক্তিযুদ্ধের বেশ কয়েকটি যুদ্ধ হয়। এর মধ্যে শুভপুর ও বিলোনিয়া যুদ্ধ অন্যতম।

২০০৯ সালে ৪ অক্টোবর ভারতকে দেশের ১৭তম স্থল বন্দর হিসেবে বিলোনিয়া স্থলবন্দর আনুষ্ঠানিকভাবে খুলে দেয়া হয়। শুরুতে ওই স্থলবন্দরের মাধ্যমে ভারত ও বাংলাদেশ উভয়পক্ষ লাভবান হওয়ার কথা বলা হলেও বাস্তবে ভারতই একতরফা সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বন্দর থেকে সুবিধা নিচ্ছে বলে বাংলাদেশী ব্যবসায়ীদের অভিযোগ। বিলোনিয়া স্থলবন্দর চালু হওয়ার পর প্রায় চার কোটি টাকা ব্যয়ে ফেনী পরশুরাম বিলোনিয়া আঞ্চলিক মহাসড়ক সংস্কার করা হয়েছিল। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত পিলার ২১৬০ এলাকায় বিলোনীয়া স্থল বন্দরের অবস্থান। অন্যদিকে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলা থেকে এর দূরত্ব ১৬ কিলোমিটার। ফেনী থেকে CNG/বাস দিয়ে পরশুরাম, পরশুরাম থেকে CNG দিয়ে বিলোনিয়া স্থল বন্দর যাওয়া যায়।


 মাইজ্জা হুজুরের মাঝার

জেলার দাগনভূঞা উপজেলার প্রাণকেন্দ্র অবস্থিত মাইজ্জা হুজুরের মাঝার। শত বছরের পুরেনো এই মাঝার সুফিজিমে বিশ্বাসী সুন্নি মুসলমানরা পবিত্রস্থান হিসেবে জ্ঞান করে। একসময় প্রায় সব মুসলমান এমনকি হিন্দুরা মনোবাসনা পূর্ণ করার জন্য মানত করতো। বর্তমানে বিভিন্ন মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইসলামের সঠিক জ্ঞান ও সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে লোক সমাগম কমে গেলেও মাজারের জৌলুস কমেনি একটুও। এখনো কিছু মানুষ মাজারে দান খয়রাত করে।

ছাদেক সাহেবের বাড়ী

দাগণভূঞার বিখ্যাত বাড়ী।  একসময় চেয়ারম্যান ছিলেন। তার বাড়ীর সামনে এই ফটক ১৯৮১সালে তৈরী। এই তাজমহলের দুপাশে বোরাক মূর্তি ছিলো । চেয়ারম্যান সাহেব শিক্ষিত ছিলেন ন না, তবে শিল্পের সমজতার ছিলেন। এখানে দুটি বোরাক মূর্তির সাথে দুটো ঈগল পাখির মূর্তিও ছিলো গেটের নিচে। এছাড়া  এখানে একটা রেপ্লিকা রয়েছে আগ্রার তাজমহলের। আকারে ছোট হলেও এটি বেশ নিখুত। বর্তামেন বোরাক মূর্তি নেই। এই মূর্তিগুলোর বৈশিস্ঠ্যছিলো  একজন দক্ষ শিল্পী প্রতিটি আঁছড় খুব নিঁখুত আর যত্নের সহিত দিয়েছেন। চেয়ারম্যান সাহেব তার মরুহম স্ত্রীর নামে এর ফটকের নাম দিয়েছেন আমিনা তাজ মহল। বাড়ীর ভেতরে পুকুর ঘাটে এখনো সেই কংক্রিটের ছাতাটা আছে আগের মতোই। এখানে বসে তিনি কখনো কখনো সালিশ দরবার করতেন। এবং পথিকরা অনায়াসে বিশ্রাম নিতে পারতো।

ছবি: ছাদেক সাহেবের বাড়ী (ছবি তুলেছেন: জাহাঙ্গীর আলম শোভন)

Published : এপ্রিল ২০, ২০১৭ | 2313 Views

  • img1

  • এপ্রিল ২০১৭
    সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
    « মার্চ   মে »
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫১৬
    ১৭১৮১৯২০২১২২২৩
    ২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
  • Helpline

    +880 1709962798