একজন জামাল নজরুল ইসলাম

Published : এপ্রিল ১৫, ২০১৭ | 1339 Views

”জনৈক জ্ঞানী ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করা হল, আপনি জ্ঞান কোথা থেকে অর্জন করেছেন? তিনি বললেন, অন্ধের কাছ থেকে। কারণ, সে মাটিতে পা ফেলে না, লাঠি দ্বারা তা ভালভাবে পরীক্ষা না করে”

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় অর্থাৎ চবির ভিসি হওয়ার জন্য মন্ত্রণালয় থেকে কয়েকবার প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। প্রতিবারই তিনি বলেছিলেন, ‘আমার চা’য়ের কাপ রিসার্চ সেন্টারে, প্রশাসনিক অফিসে নয়’।

২০০১ সালের মাঝামাঝি সময়ে পৃথিবী অচিরে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে- এ রকম একটা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল সারা বিশ্বে। বাংলাদেশের মতো পশ্চাত্পদ দেশে এই আতঙ্ক মারাত্মক হয়ে দেখা দেয়ার আগেই আমাদের সব উদ্বেগকে প্রশমিত করেছিল যাঁর অভয়বাণী তিনি প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ও গবেষক ডঃ জামাল নজরুল ইসলাম (আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যিনি জে.এন. ইসলাম নামে পরিচিত)। কোনো দৈবজ্ঞান নয়, তিনি রীতিমতো গণিতের হিসাব কষে জানান যে, আমাদের সৌরজগতের অধিকাংশ গ্রহ প্রাকৃতিক নিয়মে একই সরলরেখা বরাবর এলেও এর প্রভাবে এই গ্রহে অস্বাভাবিক কিছু ঘটার আশঙ্কা নেই।

তিনি ছিলেন স্টিফেন হকিং, ভারতীয় বিজ্ঞানী জে ভি নারলিকার, জোসেফসন, অমর্ত্য সেন, পাকিস্তানের প্রফেসর আব্দুস সালামের মতো খ্যাতিমান বিজ্ঞানীদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। মহাবিশ্বের ভবিষ্যত্ নিয়ে তাঁর একাধিক গ্রন্থ কেমব্রিজ, প্রিন্সটন, হার্ভার্ডয়ের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য। প্রচারবিমুখ এই বিজ্ঞানী কেমব্রিজে অধ্যাপনা করতেন।

লন্ডনে থাকতে হকিং বহুবার তাঁর বাড়িতে এসেছেন। জামাল নজরুল ইসলামও সপরিবারে তাঁর বাড়িতে গিয়েছেন। দুজনের কাজের প্রতি পরস্পরের আগ্রহ ছিল। হয়তো দেখা গেল জামাল নজরুল ইসলাম কোথাও লেকচার দিচ্ছেন সেখানে হকিং গেছেন তাঁর লেকচার শুনতে বা হকিং কোথাও লেকচার দিচ্ছেন সেখানে জামাল নজরুল ইসলাম গিয়েছেন তাঁর লেকচার শুনতে।

নোবেলবিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের পরিবারের সঙ্গেও বন্ধুত্ব ছিল তাঁর ও তাঁর পরিবারের। ১৯৯০ সালে অমর্ত্য সেন যখন বাংলাদেশে এলেন তখন চট্টগ্রামে গিয়ে জামাল নজরুল ইসলামের বাড়িতেই ছিলেন। বিলেতে গেলে জামাল নজরুলও তার বাসায় ঢুঁ মারতে ভোলেন না। দুজনেরই গণিতের প্রতি আগ্রহ ছিল খুব বেশি। তাছাড়াও দেশ-কাল-জাতি, অর্থনীতি নিয়ে কথা হতো তাদের ।

আব্দুস সালামের সাথে যারা নোবেল পুরস্কার পান তাদের মধ্যে Weinberg and others স্যার সম্পর্কে মন্তব্যে করতে গিয়ে বলেন, ‘‘we are particularly indebted to Jamal Islam, a physicist colleague now living in Bangladesh. For an early draft of his 1977 paper which started us thinking about the remote future”

১৯৮৫ সালে যখন নোবেল পুরস্কার প্রাপ্ত আব্দুস সালাম চবিতে এসে বলেছিলেন, ‘এশিয়ার মধ্যে আমার পরে যদি দ্বিতীয় কোনো ব্যক্তি নোবেল পুরস্কার পায়, তবে সে হবে প্রফেসর জামাল নজরুল ইসলাম’।

এছাড়া জামাল নজরুল ইসলামের প্রিয় বন্ধু ছিল বই। তিনতলা বাড়ির দোতলার তিনটা এবং তিনতলার পাঁচ-ছয়টি কামরায় থরে থরে সাজানো রয়েছে অজস্র বই।
জামাল নজরুল ইসলাম গান শুনতে, বিশেষ করে রবীন্দ্রসংগীত শুনতে এবং ছবি আঁকতে খুব পছন্দ করতেন । ছোটবেলা থেকেই গান শুনতেন এবং চেষ্টা করতে করতেই একদিন গান গাওয়া শুরু করেন তিনি।

আরেকটা খুব মজার ব্যাপার, কম্পিউটারের প্রতি জামাল নজরুল ইসলামের কোনো আগ্রহ ছিলোনা, তাঁর বাড়িতে কোনো কম্পিউটার ছিলোনা । সেহিসাবে ইন্টারনেট থাকারও প্রশ্ন ছিল না। এসব অপছন্দের কারণ জানাতে গিয়ে বলতেন , ‘কম্পিউটারে অনেক কাজ করা যায় বটে, তবে সব নয়। আর কম্পিউটারে করার দরকারই বা কী? আমার কাজের জন্য কম্পিউটার দরকার হয় না। আমি জীবনে কখনো ক্যালকুলেটর ব্যবহার করিনি। এই বিষয়ে আমি গর্বিত নই, লজ্জিতও নই। মাথা খাটিয়ে করলেই তো হয়। তাতে মস্তিষ্কের চর্চাও হয়, নিজে নিজে করাও হয়।’

তাঁর ‘দ্য আল্টিমেট ফেট অব দি ইউনিভার্স’ (মহাবিশ্বের চূড়ান্ত পরিণতি) বইটি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস থেকে ১৯৮৩ সালে প্রকাশ হওয়ার পর বিজ্ঞানী মহলে বেশ হই চই পড়ে যায়। বইটি পরে জাপানি, ফ্রেঞ্চ, ইতালিয়ান, পর্তুগিজ ও যুগোস্লাভ ভাষায় প্রকাশিত হয়। এই নিভৃতচারী বিজ্ঞানীর আরো বেশ কয়েকটি বই এর মধ্যে ‘রোটেটিং ফিল্ডস্ ইন রিলেটিভিটি’, ‘ইনট্রোডাক্শন টু ম্যাথমেটিকাল কসমোলজি’, এবং ‘ক্লাসিকাল জেনারেল রিলেটিভিটি’ নামের কঠিন কঠিন সব বই র নাম করা যায় ।

বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত ‘কৃষ্ণ বিবর’ (ব্ল্যাকহোল) এবং রাহাত-সিরাজ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত ‘মাতৃভাষা ও বিজ্ঞান চর্চা এবং অন্যান্য প্রবন্ধ’ ও ‘শিল্প সাহিত্য ও সমাজ’ নামক বইগুলি তাঁর লেখা অন্যান্য বইয়ের মধ্যে অন্যতম। সংকলন। এ ছাড়াও তাঁর দুটি জনপ্রিয় আর্টিকেল আছে। একটি হলো ‘দ্য আল্টিমেট ফেট অব দ্য ইউনিভার্স স্কাই অ্যান্ড টেলিস্কোপ’। পরে এটির স্প্যানিশ সংস্করণও প্রকাশিত হয়েছে। আরেকটি হলো ‘দ্য ফার ফিউচার অব দ্য ইউনিভার্স, এনভেডর’। এই আর্টিকেলটি জার্মান, ডাচ ও ইতালিয়ান জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।

কেমব্রিজের সোয়া লাখ টাকা বেতনের অধ্যাপনার চাকরীটি ছেড়ে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে মাত্র হাজার তিনেক টাকা বেতনে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। শুধু নিজে নয়, তাঁর প্রিয় সবাইকেই তিনি পড়াশোনা শেষে দেশে ফেরার পরামর্শ দিয়েছেন।

বাংলাদেশের আরেক বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও কল্পবিজ্ঞান লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবাল যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে ফেরার আগে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করামাত্র তিনি তাঁকেও দেশে ফেরার ব্যাপারে উত্সাহিত করেন।১৯৮৪ সালে একটি সাংবাদিক সম্মেলন হয়, সাংবাদিকরা তাকে প্রশ্ন করেছিলেন,‘কেমব্রিজের উচ্চ বেতনের অধ্যাপনার চাকরিটি ছেড়ে বাংলাদেশের চবির সামান্য বেতনে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দিতে তিনি আসলেন কেন? উত্তরে ,ড. জামাল নজরুল ইসলাম বলেন, আমি আমার দেশকে ভালোবাসি,আমি এখান থেকে নিতে আসিনি আমি দিতে এসেছি’। তিনি বলতেন , ‘প্রকৃত অর্থে যারা দেশকে ভালবাসে তারা শিক্ষক শিক্ষকের ফিল্ডে,ডাক্তার ডাক্তারি ফিল্ডে, কৃষক কৃষকের ফিল্ডে মনে প্রাণে কাজ করতে হবে। তখনি প্রকৃত অর্থে দেশকে গড়া যাবে’।

ড. জামাল নজরুল ইসলামের জন্ম ১৯৩৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি, ঝিনাইদহ জেলায়। তাঁর বাবা সে সময়ে ওখানকার মুন্সেফ ছিলেন । তাঁর বাবার বদলির সুবাদে কলকাতায় চলে যান তাঁরা।কলকাতাতে তিনি যখন শিশু বিদ্যাপীঠে পড়তেন তখন ঘোরাঘুরি করতে খুব ভালো লাগত তাঁর। পড়াশোনা একদমই করতে ইচ্ছা হতো না। স্কুলেও যেতে চাইতেন না।

পরবর্তীতে, ভর্তি হন চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলে। মেধা পরীক্ষায় তাঁর কৃতিত্ব দেখে কর্তৃপক্ষ ডাবল প্রমোশন দিয়ে তাঁকে সরাসরি ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি করে নিয়েছিলেন । এখানে পড়ার সময়ই গণিতটা ভালো লাগতে শুরু করে তাঁর। এ সময়ে তিনি নিজে নিজেই প্রচুর জ্যামিতি করতেন। এরপরে পশ্চিম পাকিস্তানের মারিতে যান, সেসময় ওখানে মেট্রিকুলেশন ছিল না। ও লেভেল ছিল, ওটা পাস করে এ লেভেল করেন ।

সে সময়ে তিনি নিজে নিজে বই পড়ে ম্যাথ করেছেন। হায়ার সিনিয়র কেমব্রিজে ম্যাথমেটিক্স পড়েছিলেন কেবল তিনি একাই। ওটা ছিল অ্যাডভান্স পর্যায়ের ম্যাথ।এরপর কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে বি.এসসি. অনার্স, তারপর কেমব্রিজে গিয়ে আবারও বিশ্বখ্যাত ট্রিনিটি কলেজ থেকে গ্রাজুয়েশন – এম.এ. করেন । কেমব্রিজ থেকেই ১৯৬৪ সালে প্রায়োগিক গণিত ও তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যা বিষয়ের ওপর পিএইচডি, একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসসি.ডি. (ডক্টর অব সায়েন্স) ডিগ্রিও অর্জন করেছিলেন ।

শাবিপ্রবি, সিলেট এর গণিত বিভাগ ও সাবেক প্রক্টর স্যারের এক স্মৃতি চারণে জেনেছিলাম, ”২০০২ সালের জানুয়ারীতে একবার সারাদেশে হরতাল চলাকালে দেশে-বিদেশের কয়েকজন গবেষক-বিজ্ঞানীরা চিটাগং এর সদরঘাট এবং অন্যান্য হোটেলে ছিলাম। সকাল দশটায় যখন আমরা স্যারের বাসায় হেঁটে পৌছি, তখন দেখতে পেলাম কয়েকজন গরিব বিহারী লোক স্যারের বাসার ফটকে।

এসময় তারা আমাকে বললো আমরা স্যারের কাছে আসছি, তাদেরকে আমাদের কনফারেন্স এর কথা বলে চলে যেতে বললাম, তারা না গেলে আমি স্যারকে ডেকে আনি। এসময় দেখলাম প্যাকেট থেকে স্যার কিছু দিলে তারা চলে গেলো। এ ঘটনায় আমরা অবাক হবার পাশাপাশি স্যারের স্ত্রীও অবাক হলেন। এবং তিনি এ ঘটনার মাধ্যমে প্রথম জানলেন যে, স্যার বেতন পাওয়ার পর প্রতিমাসের একটা অংশ তাদেরকে দিয়ে দিতেন। স্যারের স্ত্রী কৌতুক সহকারে আমাদের বললেন, ‘সংসার চালাচ্ছি আমি, কিন্তু প্রতিমাসের টাকা উনি আমাকে না দিয়ে গরিবদের বিলিয়ে দেন’।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধদের সময় জামাল নজরুল ইসলাম ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লিখে পাকিস্তানী হানাদারদের নৃশংস আক্রমণ বন্ধ করার উদ্যোগ নিতে বলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি প্রবাসীদের সঙ্গে দেশের স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করে গেছেন । ২০১৩ সালের ১৬ই মার্চ তিনি মারা যান।

আমরা আইনস্টাইন, স্টিফেন হকিং, পেনরোজ, মাইকেল টার্নার, পল ডেভিস প্রমুখদের নিয়ে চর্চা করি, কমপক্ষে নাম জানি, আমাদের এই দেশি ছাওয়াল এই বিজ্ঞানীকে এই দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধাকে কজন চিনি বা জানি ?

সূত্র: সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী বাংলাদেশ ফেসবুক পেজ থেকে।

Published : এপ্রিল ১৫, ২০১৭ | 1339 Views

  • img1

  • এপ্রিল ২০১৭
    সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
    « মার্চ   মে »
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫১৬
    ১৭১৮১৯২০২১২২২৩
    ২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
  • Helpline

    +880 1709962798