মখদুম শাহের মাজার সিরাজগঞ্জ

Published : এপ্রিল ১, ২০১৭ | 2317 Views

মখদুম শাহ মাজার

বাংলার আউলিয়া-দরবেশের মধ্যে মখদুম শাহ খুবই পরিচিতি ও শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্ব। সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুরে পুরানো শাহী মসজিদের পাশ্ববর্তী কবরস্থানে তিনি শায়িত আছেন। স্থাপত্য রীতির বিবেচনায় বলা যায় যে, শাহজাদপুর মসজিদটি মুঘলপূর্ব যুগে নির্মিত। বখতিয়ারের বাংলা বিজয়ের পর তিনি এদেশে আসেন। শাহজাদপুর দরগাহে প্রতি বছর চৈত্র মাসে (মধ্য-এপ্রিল) এক মাসব্যাপী মেলা হয়। মেলার সময় এখানে সকল সম্প্রদায়ের লোকের সমাগম হয়। দরগায় উৎসর্গীকৃত সামগ্রীর মধ্যে চাল, চিনি, মিষ্টি, মোরগ এবং চেরাগ (এক ধরণের ব্রতমূলক বাতি) প্রধান।

বাংলার মানুষের এ বিশ্বাস আর এর সৌন্দর্য গড়ে তুলেছে প্রকৃতির এক নির্লোভ নিদর্শন যা চোখে দেখেই বোঝানো যাবে, গল্প পড়ে নয়।

শাহ মখদুম (রহঃ) এর জন্ম ও বংশ পরিচিতি

হযরত শাহ মখদুম (রহঃ) ছিলেন বড় পীর হযরত আবদূল কাদের জিলানী (রহঃ) এর পুত্র আজাল্লা শাহের মেজ পুত্র। সে হিসেবে বড় পীর হযরত আবদূল কাদের জিলানী (রহঃ) ছিলেন হযরত শাহ মখদুম (রহঃ) এর দাদা। ইসলামের এক সঙ্কটময় মুহুর্তে আল্লাহর করুনায় ন্যায় ও সত্যের প্রতীক পবিত্র ইসলামের পূনরুজ্জীবনকারী মহাপুরুষ হযরত আবদুল কাদের জিলানী আল হোসেনী আল হোসায়নী (রহঃ) এর জন্ম হয়। মাতৃ-পিতৃ উভয় সুত্রেই হযরত আবদুল কাদের জিলানী (রহঃ) ছিলেন জগদ্বিখ্যাত সৈয়দ বংশের উজ্জল জ্যেতিঙ্ক। তাঁর পুন্যবান পিতার বংশ সুত্র উর্দ্ধতন পর্যায়ে আওলাদে রাসুল (দঃ) হযরত হাসান (রাঃ) এর সহিত মিলিত হয়েছে, অপর দিকে সতী সাধবী মাতার বংশক্রম উর্দ্ধতন পর্যায়ে মিলিত হয়েছে হযরত হোসেন (রাঃ) এর সংগে। এজন্যই তিনি ‘আল হাসানী এবং আল হোসেনী’ উভয়বিধ উপাধিতেও বিভুষিত হতেন। তাঁর আদি পিতৃপুরুষ ছিলেন হযরত আলী (রাঃ) সুতরাং পিতা এবং মাতা উভয় সুত্রেই তিনি বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (দঃ) এর সংগে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। বড়পীর হযরত আবদূল কাদের (রহঃ) ছিলেন হযরত শাহমখদুম (রহঃ) এর দাদা। বড়পীর সাহেবের ২৭ জন পুত্রের মধ্যে হযরত আজাল্লা শাহ ছিলেন একজন। হযরত আজাল্লা শাহের দ্বিতীয় পুত্রই হলেন হযরত শাহ্ মখদুম রূপোষ (রহঃ)।হযরত আজাল্লা শাহের তিন পুত্র ছিল। তাঁর অন্য দু’পুত্রের নাম ছিল সৈয়দ মুনির আহমদ (রহঃ) ও সৈয়দ আহমদ তন্নুরী (রহঃ) ছিলেন সকলের বড়। শাহ্ মখদুম ছিলেন মেজ এবং সৈয়দ মুনির আহমদ ছিলেন সবার ছোট। হযরত শাহ্ মখদুম (রঃ) এর পিতা হযরত আজাল্লাশাহও একজন বড় ওলী ছিলেন। দিল্লীর সুলতান ফিরোজমা হযরত আজাল্লা শাহের মুরীদ ছিলেন।
শাহ্ মখদুম (রহঃ) এর বড় ভাই হযরত সৈয়দ আহমদ তন্নুরী বড় পীর হযরত আবদুল কাদের জিলানী (রহঃ) এর কাছ থেকে স্বপ্নে পাওয়া নির্দেশেই দিল্লী থেকে কতিপয় অনুচর সহ বাংলাদেশের পানডুয়া এলকায় আসেন। পরে পানডুয়া থেকে পৌত্তলিকতা ধ্বংশ করতে করতে নোয়াখালী জেলায় হাজির হন এবং সেখানে স্থায়ী আস্তানা স্থাপন করেন। এ সাধকের মাযার শরীফ নোয়াখালী অবস্থিত।
হযরত মিরান শাহ (রহঃ) এবং সৈয়দ আবদুল কুদ্দুস (রহঃ) বিভিন্ন অবিচার অনাচার দুর করে ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে বাগদাদ শরীফ থেকে এ দেশে আসেন ৬৮৫ হিজরী সনে। হযরত মিরান শাহ্ তাঁর অনুচর সহ কাঞ্চনপুরে আস্তানা গাড়েন। হযরত আবদূল কুদ্দুস (রহঃ) নোয়াখালী জেলায় রামগঞ্জে অবস্থিত শ্যামপুরে আস্তানা গাড়েন। দু’বছর অধিক কাল শ্যামপুর এলাকার বিভিন্ন অঞ্চলে দ্বীন ইসলাম প্রচার করেন। পরে তিনি তাঁর মুরীদ হযরত সৈয়দ জকিম উদ্দীন হোসেনী (রহঃ) কে শ্যামপুর মোকামের খলিফা নিযুক্ত করেন।  শাহ মখদুম এদেশে এসে বাঘা নামক স্থানে উপস্থিত হয়ে পদ্মা নদীর নিকটস্থ যে কেল্লা স্থাপিত করেছিলেন উহাই মখদুম নগর নামে খ্যাত। মখদুম নগর রাজশাহী জেলার চারঘাট থানার অন্তর্গত। বর্তমানে এটি বাঘা শরীফ বা কসবে বাঘা নামে পরিচিত।গৌড় নগরের বাদশা হোসেন শাহের পুত্র নছবত শাহ দেশ পর্যটনকালে বিখ্যাত মখদুম নগরে উঠে সমস্ত শুনে ৯৩০ হিজরীতে একটি দীঘি খনন ও কারুকার্য খচিত প্রকান্ড মসজিদ নির্মান করে দেন। তৎপর দিল্লীর বাদশা জাহাঙ্গীরের পুত্র শাহজাহানের পরিভ্রণকালে তিনি বিখ্যাত মখদুম নগর পরিদর্শন করেন এবং পরবর্তীকালে তাঁর ভ্রমন রোয়েদাদ অনুসারে ঐ মসজিদ আদির কীর্তি রক্ষার্থে ও ধর্ম কার্যের জন্য ৪২টি মৌজা দান করেন এবং ঐ সবের তদবীর তদারক ও দেখাশুনার জন্য ঐ নগরে কিছু লোক লস্কর রেখে আল্লাবকস বরখোরদারকে লস্কর প্রধান নিযুক্ত করেন। শাহ মখদুম (রহঃ) এর আগমনের সময় রাজশাহী শহরের নাম ছিল ‘মহাকালগড়’। তবে পরে এ নাম রামপুর বোয়ালিয়াতে রূপান্তরিত হয়।

রামপুর বোয়ালিয়া ( বর্তমানে দরগাপাড়া নামে পরিচিত) কে পূর্বে মহাকালগড় বলা হত। এ স্থানে বহু রকমের দেও এর প্রতিমুর্তি ও বহু মঠ-মন্দির পূর্ন ছিল। এখানে মহাকাল দীঘি নামে একটা প্রকান্ড দীঘি ছিল। এখানে ৩০/৪০ বিঘা জমির উপর দেও রাজার বাড়ী ছিল। তৎকালিন দৈত্য ধর্মালম্বিদিগের প্রধান তীর্থ স্থান ছিল এ রামপুর বোয়ালিয়া। তাদের ধর্মমতে এখানে এসে নরবলি দিত। অনেক সময় লোক মানূষ খরিদ করে আনত। কখনও আবার জোর করে ধরে আনত। অনেকে আবার আসত স্বেচ্ছায়। কাহারও সনতান না হলে মানত করত যে সন্তান হলে একট বলি দেবে। এখানে দু’জন দেওরাজা ছিল তাদেরকে মানুষ ঈশ্বরের অবতার বলে বিশ্বাস করত।কয়েকজন মুসলমান দরবেশ এ অঞ্চলে আসলে তাদেরকে ধরে বলি দেওয়া হয়। এ সংবাদ বাগদাদ শরীফে পৌছালে পীরানে পীর দস্তগীর দপ্তর হতে হযরত তুরকান শাহকে রামপুর বোয়ালিয়াতে ধর্ম প্রচারের জন্য পাঠানো হয়। তিনি কিছু অনুচর সহ এ স্থানে পৌছলে এবং ধর্ম প্রচার শুরু করলে দেও রাজের সাথে সংঘর্ষ বাধে এবং তুরকান শাহ তাঁর হাতের লাঠি দ্বারা বহু দেও ধর্মালম্বির প্রাণ নাশ করেন। ফলে জীবন্ত অবস্থায় এ ফকিরকে বেধেঁ আনার আদেশ হয়। রাত্রিকালে এ ফকিরকে বেধেঁ ফেলা হয়। কিন’ শত শত লোক চেষ্টা করেও হযরত তুরকান শাহকে তাঁর গদী হতে সরাতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত ঐ স্থানেই তাঁকে ৬৭৭ হিঃ সনে হত্যা করা হয়। কিন্তু লাশ হস্তী লাগিয়ে বিন্দু মাত্র স্থানান্তর করতে না পেরে ঐ স্থানেই তাকে পুঁতে রাখা হয়। আজও উক্ত স্থান বর্তমানে দরগাপাড়ায় তুরকান শহীদের আস্তানা নামে খ্যাত।রামপুর বোয়ালিয়ায় হযরত তুরকান শাহের শহীদ হওয়ার সংবাদ শুনে হযরত শাহ মখদুম (রহঃ) দানবকুলকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্য এখানে আসেন।

মহাকাল গড়ের যুদ্ধ :
হযরত তুরকান শাহ ও অন্যান্য মুসলমানদের হত্যার প্রতিবাদ এবং সমাজ থেকে অনাচার অত্যাচার দুর করে দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য শাহ্ মখদুম (রহঃ) কে তিন তিন বার দেও রাজার সাথে যুদ্ধ করতে হয়।প্রথম বারে তিনি তার লোকজন নিয়ে দেও রাজপ্রসাদ ঘিরে রাখেন। দেও ধর্মালম্বীগণ সমবেত হয়ে যুদ্ধ করে অনেক দেও ধর্মালম্বী মারা গেল। শাহ মখদুম (রহঃ) এর পক্ষেও কিছু লোক শহীদ হলেন। শেষ দিনের যুদ্ধে দরবেশগণের কিছু ঘোড়া শহীদ হল। যেখানে ঘোড়া শহীদ হয় উক্ত স্থানটি ঘোড়ামারা নামে খ্যাত।  দৈত্য ধর্মালম্বীগণ বুঝতে পারল এ দরবেশগণকে না তাড়াতে পারলে তাদের কোন শান্তি নেই। তাই তারা দিক দিগন্তে সংবাদ পাঠিয়ে যুদ্ধের প্রসত্তুতি নিতে লাগল। হযরত শাহ মখদুম (রহঃ) ধ্যানে উহা জানতে পেরে তাদের প্রতিরোধের জন্য স্থানে স্থানে ফকির দরবেশ মোতায়েন করলেন এবং নিজেও এ যু্দ্ধ শরীক হলেন। বহু দৈত্য ধর্মলম্বী ধরাশায়ী হল। কিছু সংখ্যাক পালিয়ে গেল, মঠ মন্দির ভেঙ্গেচুরে লুট হল।

মঠ মন্দিরের সে বড় বড় পাথর ও পাথর মুর্তি আজও রাজশাহীর বিভিন্ন স্থানে দেখা যায়। লোকজন সেগুলি বসা ও শোয়ার আসন হিসাবে নানাবিধ কাজে ব্যবহার করে আসছে। দৈত্য রাজ সপরিবারে পালিয়ে জীবন রক্ষা করল। মহাকাল গড়ের যুদ্ধের শহীদদের কবর মখদুম মাযার প্রাঙ্গণে আজও বিদ্যমান যা সে যুদ্ধের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে।

শাহ মখদুম (রহঃ) এর স্মৃতি চিহ্ন হিসেবে আজও তাঁর ব্যবহৃত একখানি খড়ম, একটা বসবার পীড়ি, পাগড়ী ও কোরআন শরীফ রক্ষিত আছে। প্রতিবছর ‘ওরশ’ শরীফের দিন এসব চিহ্ন প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হয়।

সাবেক জজ আনিস কামাল এর লেখনি হতে সংক্ষেপিত।

Published : এপ্রিল ১, ২০১৭ | 2317 Views

  • img1

  • এপ্রিল ২০১৭
    সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
    « মার্চ   মে »
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫১৬
    ১৭১৮১৯২০২১২২২৩
    ২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
  • Helpline

    +880 1709962798