জাগরণের পদযাত্রা: ১৯৭১

Published : এপ্রিল ১, ২০১৭ | 1670 Views

জাগরণের পদযাত্রা ১৯৭১

জাহঙ্গীর আলম শোভন

মুক্তিযুদ্ধ এদেশের বিভিন্ন বাহিনীর সৈনিকদের। মুক্তিযুদ্ধ মুক্তিসেনাদের। মুক্তিযুদ্ধ এদেশের আপামর জনসাধারণের। যারা রনাঙ্গনে লড়াই করেছেন তারা ছাড়াও অনেকে অনেকভাবে মুক্তিযদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। কেউ মুক্তিযোদ্ধাদের খাবারের যোগান দিয়েছেন। দেশে বিদেশে কেউবা জনমত গঠনে কাজ করেছেন। কেউবা গোপন সংবাদ দিয়ে সগযোগিতা করেছেন। কেউ দিয়েছেন পরম মমতায় আশ্রয়, মুক্তিসেনাদের।

তেমনি এক ব্যতিক্রমী মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। ৩৮ জন যুবক। তারা বিশ্ববিবেক জাগ্রত করার জন্য বেনাপোল থেকে অক্টবর ১৯৭১ হাঁটা শুরু করেছিলেন দিল্লী অভিমুখে। ‍সে পদযাত্রার খবর আমরা অনেকে জানি না।

যুদ্ধ তখন পুরোদমে চলছে। পাকিস্তানী বাহিনীর চোখে হত্যা ও ধর্ষনের লালসা আর বাংলাদেশের মানুষের চোখে স্বাধীন হওয়ার স্বপ্ন। যুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন হলেই চলবেনা এজন্য প্রয়োজন হবে বিশ্বের স্বীকৃতি। বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্ব জনমত সৃষ্টি করার জন্য ১৪ অক্টোবর মুর্শিদাবাদ থেকে  যাত্রা শুরু করেন তারা ১৪০০ মাইল যাওয়ার জন্য। পথে থেমে তারা পথসভা করতেন, জনগণের সাথে কথা বলতেন। সাংবাদিকদের কাছে তুলে ধরতেন পাক বাহিনীর বর্বরতার কাহিনী। প্রথমে তারা ৩৪ জন ছিলেন। ১৯৭১ সালের ১৪ অক্টোবর মুর্শিদাবাদে  এসে যোগ দেন আরও ৪ জন। ১৫ অক্টোবর ১৯৭১ সালে ভারতের মুর্শিদাবাদে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় লংমার্চের কার্যক্রম।

আরো একটা কারণ ছিলো এই পদযাত্রা আয়োজনের। নিরীহ নিরাপরাধ বাঙালিদের নির্মম নির্যাতনে কিছু মানুষ জীবন নিয়ে দলে দলে মানুষ আশ্রয় নেয়  ভারতে।  ভারতের কিছু রাজ্যের মানুষ এতে নাখোশ হয়। শরণার্থীদের সাহায্য আর মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং এর জন্য তারা ইন্দরাগান্ধি সরকারের সমালোচনা করতে থাকে।  ওই অবস্থায় ভারতবাসীকেও একটা ইতিবাচক বার্তা দেয়ার প্রয়োজন ছিলো। বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবিতে বিভিন্ন দূতাবাসে স্মারকলিপি প্রদান, পাকিস্তানি সেনা কর্তৃক গণহত্যা ও হত্যাযজ্ঞের বর্ণনা তুলে ধরা, স্বাধীনতার পক্ষে বিশ্ব জনমত গড়ে তোলা তোলা ছিলো এই শিক্ষিত তরুনদের কাজ। ১৫ অক্টোবর থেকে পথচলা শুরু করে তারা ১৭ ডিসেম্বর ১৯৭১ পর্যন্ত উত্তর প্রদেশে গিয়ে পৌছেন। ইচ্ছাছিলো ৩০ জানুয়ারী দিল্লী পৌছে যাওয়া । দেশি- বিদেশি গণমাধ্যমগুলোতে গুরুত্বের সঙ্গে প্রচারিত হতে থাকে পদযাত্রার খবর।  ১৮ ডিসেম্বর উত্তর প্রদেশের রাজধানী লখনৌতে বিশাল আয়োজনে বাংলাদেশের বিজয় দিবস পালিত হয়। সেই অনুষ্ঠানে ভারতীয় সেনা, নৌ, বিমান বাহিনীর সাথে বাংলাদেশের ৩৮ জনের এই দল অংশ নেন। উপস্থিত শত শত সাংবাদিকের মাধ্যমে ছড়িয়ে গেল ভারতে বাংলাদেশের বিজয় উদযাপনের খবর।

পদযাত্রার ক্যাপ্টেন ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিক্সের ছাত্র আবদুল খালেক। ডেপুটি লিডার ছিলেন ২ জন। খুলনার একরামুল ইসলাম ও কামরুল আনাম। দলে যারা ছিলেন: রফিকুল ইসলাম, খলিলুর রহমান, মুরারী মোহন সরকার, বিনয় কুমার বিশ্বাস, আজিজুর রহমান, মোহাম্মদ আবু বকর, পরিতোষ কুমার মণ্ডল, আব্দুল লতিফ (১), আব্দুল লতিফ (২), সৈয়দ রবিউল হক, দুলাল দত্ত মণ্ডল, ওহিদুজ্জামান চাকলাদার, তুষার কান্তি সুর, শেখ আনোয়ার কামাল, সুভাষ চন্দ্র বসু, অমিত দেব, ক্ষিতিশ চন্দ্র মন্ডল, আনন্দ মোহন রায়, প্রদীপ কুমার শীল, আব্দুস সামাদ, আনোয়ারুল কাদির, পরিতোষ কান্তি কবিরাজ, দেলোয়ার হোসেন, অনিল কুমার বিশ্বাস, মইন উদ্দিন, সহিদুল ইসলাম, বিশ্বনাথ সাহা, সমীর কুমার বসু, ওমেদ আলী, আবু বকর সিদ্দিকী, শামসুল হক, মতিলাল দাস,

দেড় মাস ধরে দলটি প্রতিদিন গড়ে ১৫-১৬ মাইল পায়ে হেঁটে পাড়ি দিত। সাধারণত প্রতিদিন বিকেলে বিকেলের বিভিন্ন এলাকায় জনসভার আয়োজন করা হতো। অসংখ্য উঠোন বৈঠকও অংশনিয়েছিলেন তারা।  সাংবাদিকদের সাথেও কথা বলেছেন।  পদযাত্রার দলটি এভাবে মুর্শিদাবাদ, সেইনথিয়া, সুরি, শান্তি নিকেতন, ককশা, দুর্গাপুর, রাণিগঞ্জ, আসানশোল, নিয়ামতপুর, কুলটি, চিত্তরঞ্জন ও বিহার, পাটনা, লাখনৌ, আগ্রাসহ প্রভৃতি স্থানে ভ্রমণ করে। কিন্তু ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জন হওয়ায় ১৭ ডিসেম্বর ভারতের উত্তর প্রদেশে এসে পদযাত্রাটি শেষ করতে হয়।

মহাত্মা গান্ধীর অহিংস নীতিতে বিশ্বাসী এমন আটটি সংগঠন মিলে ভারতের ‘অখিল ভারত শান্তি সেনা মঙ্গল’-সংগঠন এর নেতৃত্বে  জাগরণ পদযাত্রায় সগযোগিতা করে। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল, বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং সহযোগিতার জন্য  জনমত গঠন করা। এই পদযাত্রা দলের শোভাযাত্রা ও সমাবেশের খবর ভারতীয় স্থানীয় বেতারে ও পত্রিকায় পচার।

বিভিন্ন স্থানে তাদের সাথে যোগ দিয়েছিলেন চিত্র পরিচালক সুভাষ দত্ত, মৃণাল সেন, শিল্পী সঞ্জীদা খাতুন, ভলেন্ট্রিয়ার সার্ভিস কোরের নেতা মোখলেসুর রহমান খোকন, দেবব্রত সিংহ প্রমুখ। তারা বিভিন্ন স্থানে বেশ কিছু উপহার পান বাংলাদেশের জন্য। যেমন সোনার ছোট্ট নৌকা, একটি রেডিও, দুটি তলোয়ার, দুটি ছোরা, বেশ কিছু বই।

এই পদযাত্রার একটি শিক্ষনীয় দিক রয়েছে তা হলো। মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়ে গেলেও আজো আমাদের সুযোগ রয়েছে মুক্তিযুদ্বের স্বপ্নকে সফর করার জন্য আমরা দেশের উন্নয়নে মানুষকে এগিয়ে আসতে দেশ গড়ার কাজে অংশ নিতে পারি। সে ৩৮ জন তরুন সেনা আমাদের শিখিয়েছেন আমরা বিভিন্নভাবে দেশগড়ার কাজে অংশ নিতে পারি।

ছবি: সালেক খোকন

সূত্র: সামহোয়ার ইন ব্লগ। দৈনিক ইত্তেফাক

 

Published : এপ্রিল ১, ২০১৭ | 1670 Views

  • img1

  • এপ্রিল ২০১৭
    সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
    « মার্চ   মে »
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫১৬
    ১৭১৮১৯২০২১২২২৩
    ২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
  • Helpline

    +880 1709962798