কিডনির চিকিৎসা প্রসঙ্গে

Published : জানুয়ারি ১৩, ২০১৭ | 1024 Views

কিডনির চিকিৎসা প্রসঙ্গে

জনসাধারণকে কিডনির রোগ সম্পর্কে সচেতন করা উচিত। প্রতিদিন কমপক্ষে ঘণ্টাখানেক ধরে হাঁটতে হবে। খাদ্য এবং খাদ্যাভ্যাস বদলাতে হবে। তৈলাক্ত খাবার, মসলাযুক্ত খাবার, ফাস্ট ফুড ও ধূমপান পরিহার করা অতীব প্রয়োজনীয়। ক্যামিক্যাল যুক্ত খাবার, রংমাখা খাবার, অস্বাস্থ্যকর উপাদানযুক্ত খাবার ও ভেজাল খাদ্য সমস্যা জটিল করে তোলে। উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে নিয়মিত পানি পান করতে হবে।

কিডনি অকেজো রোগীর চিকিৎসা মূলত তিনটি পদ্ধতিতে সীমিত।

প্রথমটি হলো কিডনি রোগের চিকিৎসার সুবিধা আছে এমন হাসপাতাল বা ক্লিনিকে সপ্তাহে তিন বা চারবার তিন-চার ঘণ্টা করে হেমোডায়ালিসিস  করানো। ক্ষেত্রবিশেষে সপ্তাহে দুইবার হেমোডায়ালিসিসেও কাজ হয়।

দ্বিতীয় পদ্ধতি হচ্ছে পেরিটোনিয়াল ডায়ালিসিস, যার পুরো নাম হচ্ছে CAPD (Chronic Ambulatory Peritoneal Dialysis)। এই পদ্ধতির সুবিধা হচ্ছে, রোগী নিজে বা একজন পরিচর্যাকারীর সাহায্যে পেটের গহ্বরের আবরণীর (Peritoneal Membrane) মধ্যে বিশেষ ফ্লুইড ঢুকিয়ে কয়েক ঘণ্টা পর বের করে নেন। বেরিয়ে আসা ফ্লুইড শরীরের অপ্রয়োজনীয় বা ক্ষতিকর পদার্থগুলো রক্ত থেকে শুষে নিয়ে আসে।

এই পদ্ধতির সুবিধা হচ্ছে, এর জন্য কোনো ধরনের মেশিনের প্রয়োজন হয় না। তবে অত্যন্ত জীবাণুমুক্ত  পদ্ধতি অনুসরণ না করলে জীবাণু সংক্রমণ ও প্রদাহের  আশঙ্কা থাকে। খরচ হেমোডায়ালিসিসের সমপরিমাণ, এমনকি বেশিও হতে পারে। সরকারি ভ্রান্ত নীতিমালার কারণে এই দুরবস্থা। প্রতিবার পেটে কতক রাসায়নিক দ্রব্য  মেশানো জীবাণুমুক্ত পানির খরচ পড়ে প্রায় চার হাজার টাকা।

তৃতীয় এবং সবচেয়ে উত্তম পদ্ধতি হচ্ছে দাতার কিডনি বিকল কিডনি রোগীর শরীরে প্রতিস্থাপন। এটা কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট (Kidney Transplant) নামে পরিচিত। সরকারি আইনে কিডনির সহজপ্রাপ্যতা নিশ্চিত করা হয়নি।

সারা দেশে প্রায় ৯০টি কিডনি ডায়ালিসিস সেন্টার আছে। এর মধ্যে মাত্র ১১টি সরকারি। সরকারি কেন্দ্রে ডায়ালিসিসের খরচ খুবই কম, কিন্তু অযৌক্তিক। প্রতিবার হেমোডায়ালিসিস মেশিন ব্যবহারের খরচ মাত্র ৪০০ টাকা। তবে সিরিয়াল প্রাপ্তি ও বিভিন্নভাবে সৃষ্ট হয়রানি নিরসনের জন্য একাধিক দালাল ও কর্মচারীর সঙ্গে লেনদেন ব্যয় যোগ করলে সরকারি হাসপাতালে প্রতিবার হেমোডায়ালিসিসের খরচ বেসরকারি কেন্দ্রের অনুরূপ, কিন্তু হয়রানি-অবহেলা অনেক বেশি।

২০টি বেসরকারি কিডনি সেন্টারে মাত্র দুই থেকে পাঁচটি ডায়ালিসিস মেশিন আছে। অন্য ৩০টি বেসরকারি সেন্টারে ছয় থেকে ১০টি হেমোডায়ালিসিস মেশিন আছে। অপর ৩০টি সেন্টারে ১১ থেকে ২০টি ডায়ালিসিস মেশিন আছে। পাঁচটি বড় বেসরকারি হাসপাতালে ২১ থেকে ৩০টি ডায়ালিসিস মেশিন আছে। মিরপুরের কিডনি ফাউন্ডেশন হাসপাতালে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি মেশিন আছে—৬৫টি।

বেশির ভাগ বেসরকারি কিডনি সেন্টারে নেফ্রোলজিস্ট দূরে থাক, কোনো ডাক্তারও থাকেন না। সামান্য কিছু প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত টেকনিশিয়ান এসব মেশিন দেখাশোনা করেন। রোগীর সমস্যা হলে তাঁরা বাইরে থেকে নির্ধারিত ডাক্তার ডেকে আনার চেষ্টা করেন। তা না হলে রোগীকে দ্রুত অন্যত্র পাঠিয়ে দেন অ্যাম্বুল্যান্সে করে।

নিজ বাড়িতে বা কর্মস্থলে বসে পেরিটোনিয়াম ডায়ালিসিস করালে মাসে খরচ পড়বে প্রায় ৪০ হাজার টাকা। একজন সেবাকর্মীর সাহায্য নিলে খরচ আরো বাড়বে।

সরকারি ও বেসরকারি ১০টি হাসপাতালে কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট করা হয়।

সরকারি হাসপাতালে ট্রান্সপ্লান্ট খরচ খুবই কম এবং যুক্তিসংগত। কিন্তু অবহেলা ও অব্যবস্থাপনার কারণে তারিখ পাওয়া যায় না। বেসরকারি হাসপাতালে ট্রান্সপ্লান্ট খরচ তিন থেকে সাত লাখ টাকা। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রোগী বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করে কয়েক লাখ টাকা দিয়ে গরিব মানুষের কিডনি কিনে আনেন। পুরো টাকা গরিব দাতা পান না; দালালরা নিয়ে নেয়। ট্রান্সপ্লান্ট রোগীর ওষুধ বাবদ প্রতিবছর আরো ২৫ হাজার টাকা খরচ হয়। যিনি কিডনি দান করেছেন, তাঁর শারীরিক অসুস্থতার জন্য বছরে আরো ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা খরচ হয়। একই অপারেশন শ্রীলঙ্কা বা সিঙ্গাপুরে করালে রোগী ও দাতার আসা-যাওয়াসহ খরচ পড়ে ৩০ লাখ থেকে এক কোটি টাকা।

দুর্ভাগ্যবশত বাংলাদেশের কিডনি প্রতিস্থাপন আইনের পরিধি খুব সংকীর্ণ ও সীমিত বলে ৫০ শতাংশ রোগী, যাঁরা রক্তের সম্পর্কের কিডনিদাতা জোগাড় করতে পারেন না, তাঁদের অন্য দেশে যাওয়া ছাড়া কোনো গতি থাকে না। সরকার সম্প্রতি কিডনি হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে যে নতুন নিয়মাবলি প্রণয়ন করতে যাচ্ছে, তাতে ভালোর  চেয়ে নতুন ঝামেলা ও দুর্নীতি বৃদ্ধি পাবে মাত্র।

বাংলাদেশে ৯৭ শতাংশ রোগী হেমোডায়ালিসিস, ২ শতাংশ অনধিক CAPD এবং ১ শতাংশের অনধিক কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট করার সুবিধা পায়।

করাচি শহরের সিন্ধু ইনস্টিটিউট অব ইউরোলজিক্যাল সায়েন্সেস পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (PPP) পদ্ধতিতে ডা. রিজভী ও তাঁর সহকর্মীরা পরিচালনা করে থাকেন। এটা নিঃসন্দেহে উপমহাদেশের সবচেয়ে উন্নতমানের কিডনি সেন্টার। এখানে চিকিৎসার জন্য রোগীকে কোনো খরচ দিতে হয় না। ধনী-দরিদ্র   নির্বিশেষে সবাই  কিডনি চিকিৎসা ফ্রি পায়।

রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত সামাজিক স্বাস্থ্য বীমার আওতায় এশিয়ায় তাইওয়ান ও ইরান, সেন্ট্রাল আমেরিকার কিউবা এবং ব্রিটেন ও ইউরোপীয় দেশগুলোর সব নাগরিক বিনা খরচে হেমোডায়ালিসিস সুবিধা পেয়ে থাকে। এসব দেশে প্রতিদিন পাঁচ-ছয়টি সেশনে হেমোডায়ালিসিসের সুবিধা আছে। প্রত্যেক রোগীর জন্য একটি কৃত্রিম পলি নেফ্রন (ডায়ালিসিসের কৃত্রিম ছাঁকনি) আলাদা করে রাখা হয়, যা খুব সতর্কতার সঙ্গে ধুয়ে পরিষ্কার করে জীবাণুমুক্ত যন্ত্রে (অটোক্লেভে) পরিপূর্ণভাবে জীবাণুমুক্ত করে এক মাস ধরে বারবার ব্যবহার করা হয়। গড়ে একটি কৃত্রিম পলি নেফ্রন প্রতি মাসে ৮ থেকে ১২ বার ব্যবহৃত হয়।

ভারতের মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ু, গুজরাট, কর্ণাটক, কেরালাসহ বেশ কয়েকটি রাষ্ট্রে উপজেলা পর্যায়েও ভালো ডায়ালিসিস ব্যবস্থা চালু আছে সুলভ মূল্যে। প্রতিবার হেমোডায়ালিসিসের জন্য সেন্টারভেদে ৬০০ থেকে এক হাজার ভারতীয় রুপি খরচ পড়ে। এসব কিডনি সেন্টারের জন্য ভারতীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ নাগরিকরা উদার হস্তে দান করেন।

বাংলাদেশে বিকল কিডনির ডায়ালিসিস ব্যয় এত বেশি যে সর্বোচ্চ তিন বছরের মধ্যে বেশির ভাগ রোগী (৯০ শতাংশের বেশি) চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে না পেরে চিকিৎসা বন্ধ করে মৃত্যুর দিন গোনেন। যেসব রোগীর ন্যূনতম একজন আত্মীয় মরুভূমির দেশে শ্রম দান করেন না, তাঁরা সাধারণত এক বছর পর আর চিকিৎসা ব্যয় চালাতে পারেন না।

সূত্র: জাফরুল্লাহ চৌধুরীর লেখা থেকে।

 

Published : জানুয়ারি ১৩, ২০১৭ | 1024 Views

  • img1

  • Helpline

    +880 1709962798