কিভাবে দেশে কিডনী চিকিৎসায় ব্যয় কমানো সম্ভব?

Published : জানুয়ারি ১২, ২০১৭ | 1004 Views

বিকল কিডনির সাপ্তাহিক চিকিৎসা ব্যয় অর্ধেকই কমানো সম্ভব

কিডনি রোগ একটি অনাসংক্রামক রোগ। কিডনির প্রদাহ, কিডনির পাথর, পারিবারিক কিডনি রোগ, নেফ্রটিক সিনড্রোম, নেফ্রারাইটিশ, অনিয়ন্ত্রিতউচ্চ রক্ত চাপ, বহুমূত্র, ছেলে-মেয়ের খোস পাঁচড়া, দীর্ঘদিন ধরে অত্যাধিক ব্যথানাশক ওষুধ সেবন ও ঘন ঘন পরিবর্তন করে বিবিধ এন্টিবায়োটিকের ব্যবহার এবং সময়মতো দ্রুতপানিস্বল্পতা ও রক্তক্ষরণের চিকিৎসা না নেয়া বিকল কিডনির মূল কারণসমূহের অন্যতম। জলবায়ু পরিবেশের অবনতি, বাজারের ফাস্ট ফুড ওভেজাল খাদ্যও বিকল কিডনি বিস্তারে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। ক্রমেই বাংলাদেশে কিডনি রোগের প্রকোপ বাড়ছে। বাংলাদেশে প্রতিঘণ্টায় ৫ জন কিডনি রোগে মারা যায়। প্রাথমিক অবস্থায় কিডনি রোগ চুপিসারে আসে। সরকারি বিবরণ ও বাংলাদেশ কিডনি সংস্থার গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে বাংলাদেশে দেড় থেকে দুই কোটি ব্যক্তি বিভিন্ন প্রকার কিডনির রোগে ভুগছেন। যা পর্যায়ক্রমে দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে পরিণত হয়। স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালকের, ৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৪ তারিখের তথ্য অনুসারে চূড়ান্ত পর্যায়ের কিডনি রোগীর বা বিকল কিডনি রোগীর আনুমানিক সংখ্যা হচ্ছে ০.৮ মিলিয়ন অর্থাৎ (৮ লাখ) যাদের ডায়ালাইসিস বা ট্রান্সপ্লান্ট প্রয়োজন। অর্থাৎ এসব ব্যক্তির কিডনির বর্তমান কার্যক্ষমতা শতকরা ১৫% চেয়েও কম। প্রতি বছর ত্রিশ হাজার নতুন বিকল কিডনি রোগীর ডায়ালাইসিনসের প্রয়োজন হচ্ছে। হƒদরোগ আক্রমণে মৃত্যুর চেয়ে চিকিৎসা বঞ্চিত বিকল কিডনির মৃত্যুর সম্ভাবনা দশ গুণ বেশি।

ক. বিকল কিডনি রোগীর রক্তে হিমোগ্লোবিন বৃদ্ধির জন্য প্রতি সপ্তাহে কমপক্ষে একটি দুই থেকে পাঁচ হাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিটের ০.৫ মিলিলিটারের (৭ ফোঁটাসম) রিকমভিন্যান্ট অ্যারিথ্রোপয়েটিন ইনজেকশন চামড়ার নিচে নিতে হয়। ওষুধটির কম্পানি নির্ধারিত মূল্য হচ্ছে দুই হাজার ১০০ টাকা। ১৯৮২ সালের জাতীয় ওষুধ নীতির মূল্য নির্ধারণ নীতি অনুসরণ করা হলে ইনজেকশনটির ভ্যাটসহ খুচরা মূল্য হবে সর্বোচ্চ ৬০০ টাকা।

খ. রক্তের কণাগুলোর একত্রীভূত হওয়া প্রতিহত করার জন্য পাঁচ মিলিলিটার হেপারিন সোডিয়াম ইনজেকশন ডায়ালিসিসের সময় শিরার মাধ্যমে ইনজেকশন দিতে হয়। আমদানীকৃত এক অ্যাম্পুল হেপারিনের মূল্য ৩৩০ টাকা। উত্পাদনপ্রক্রিয়া সহজ, তবে বাজার অপেক্ষাকৃত ছোট এবং দেশে উত্পাদনের জন্য সরকারের কোনো উৎসাহ না থাকায় ওষুধটি দেশে উত্পাদিত হয় না। ১৯৮২ সালের জাতীয় ওষুধ নীতির মূল্য নির্ধারণ নিয়মাবলি অনুসরণ করা হলে ওষুধটির ভ্যাটসহ সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য হবে ১৩০ টাকা।

গ.  আমদানীকৃত ফ্লুুইডের মূল্য অনেক বেশি। আমদানি রহিত করে শুধু দেশি কম্পানিগুলোকেই এসব বিশেষ ফ্লুুইড তৈরির জন্য ২৫ শতাংশ ইনসেনটিভ সুবিধা দিলে CAPD ফ্লুইড পর্যাপ্ত পরিমাণে দেশে সুলভে উত্পাদিত হবে।

ঘ. ডায়ালিসিস যন্ত্র ও পানি বিশুদ্ধকরণ যন্ত্র পুরোপুরি শুল্ক ও ভ্যাটমুক্ত হতে হবে। এক ইউনিট ডায়ালিসিস যন্ত্র ও পানি বিশুদ্ধকরণ যন্ত্রের মূল্য ১৪ থেকে ২০ লাখ টাকা।

ঙ. আমদানীকৃত কৃত্রিম পলি নেফ্রন ও তার সংশ্লিষ্ট সব টিউবিংয়ের ওপর থেকে সব ধরনের শুল্ক কর ও ভ্যাট রহিত করা বাঞ্ছনীয়। ডায়ালিসিসের খরচের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কৃত্রিম পলি নেফ্রনের (ডায়ালিসিস) নিমিত্তে। ডায়ালিসিসের মূল যন্ত্রে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ এবং বহুল ব্যবহৃত পলি নেফ্রন ও টিউবিংগুলো জীবাণুমুক্ত করার যন্ত্রগুলো ও অটোক্লেভের ওপর থেকে সব ধরনের শুল্ক কর ও ভ্যাট পুরোপুরি রহিত করতে হবে।

চ. বিকল কিডনির রোগীকে চিকিৎসকরা ওষুধ কম্পানির প্রতিনিধি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ১২ থেকে ১৪টি ওষুধ প্রেসক্রিপশনে লেখেন। সুষ্ঠুভাবে Prescription Audit প্রয়োগ করলে চিকিৎসকরা বাণিজ্যিক স্বার্থ পরিত্যাগ করে চার-পাঁচটি প্রয়োজনীয় ওষুধে সীমিত করবেন।

জ. হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর হোল্ডিং ট্যাক্স ও পানি-বিদ্যুৎ কর কমানো।

ঝ. অঙ্গ দান ও প্রতিস্থাপন আইনের সত্বর সংশোধন প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট আইনের পরিধি অত্যন্ত সীমিত ও রক্ষণশীল। এই আইন মোতাবেক রক্তের সম্পর্কিত আত্মীয়স্বজন ছাড়া অন্য কারো কিডনি বা অন্য অঙ্গ দানের সুবিধা নেই। সুস্থ অনাত্মীয় যদি বিনা মূল্যে বা সরকার নির্ধারিত মূল্যে কোনো অঙ্গ দান করেন, অসুবিধা কোথায়? ভালোভাবে অঙ্গ দান পদ্ধতি চালু রাখার জন্য একটি কেন্দ্রীয় রেজিস্টার পদ্ধতির প্রচলন করতে হবে। এটা পরিচালনায় সরকার, সুধীসমাজ ও দাতাদের প্রতিনিধি যুক্ত থাকবেন। দাতার সুস্থতার জন্য এই কমিটি নজর রাখবে। কোনো রোগী সরাসরি দরাদরি করে কিডনি কিনতে পারবেন না। অবস্থাপন্ন রোগীরা কিডনির জন্য সেন্ট্রাল রেজিস্টারে ১০ লাখ টাকা দান করবেন। দরিদ্রদের কিডনিপ্রাপ্তির জন্য কোনো টাকা দিতে হবে না। তাঁরা বিনা মূল্যে কিডনি প্রতিস্থাপনের সুবিধা পাবেন।

এ ছাড়া ব্যয় সাশ্রয়ের জন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের করণীয়—

ক. ইকোনমি অব স্কেল—ছোট ইউনিটে অপেক্ষাকৃত ব্যয় বেশি। তদুপরি ছোট ইউনিটে বিজ্ঞানসম্মত মান নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। ছোট ইউনিটে নেফ্রোলজিস্ট রাখা হয় না এবং পাওয়া যায় না। এমনকি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসকও সার্বক্ষণিক থাকেন না। তাই যেসব সেন্টারে ১০টির কম ডায়ালিসিস মেশিন আছে তারা একত্র হয়ে ২০ ইউনিটের সেন্টারে উন্নত হবে, যেখানে একজন পার্টটাইম নেফ্রোলজিস্ট নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হবে। দুজন কিডনি বিষয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসককে সার্বক্ষণিকভাবে নিয়োগ দিয়ে কর্তৃপক্ষ মান নিশ্চিত করতে পারবে।

খ. সপ্তাহে সেন্টার সাত দিন চালু রাখবে এবং প্রতিদিন চারবার ডায়ালিসিস মেশিন সচল রাখার ব্যবস্থা নেবে। এতে রোগী ও মালিক উভয় পক্ষেরই সাশ্রয় হবে।

গ. চিকিৎসকদের ব্যবস্থাপত্রের মনিটরিংয়ের জন্য সরকারকে সহায়তা দেবে।

সূত্র: গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রর পরিচালক জাফরুল্লাহ চৌধুরীর লেখা থেকে। দৈনিক মানবকণ্ঠ)

 

Published : জানুয়ারি ১২, ২০১৭ | 1004 Views

  • img1

  • Helpline

    +880 1709962798