চট্টগ্রাম বাংলার প্রবেশদ্বার

Published : অক্টোবর ৩১, ২০১৬ | 1073 Views

চট্টগ্রাম বাংলার প্রবেশদ্বার
জাহাঙ্গীর আলম শোভন

গোটা চট্টগ্রামই হলো বাংলাদেশের প্রবেশদ্বার। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে যুগ যুগ ধরে অভিযাত্রীরা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন। চট্টগ্রাম শহর নগর এবং জনপদ হিসেবেও পরিচিত বিশ্বজুড়ে।চট্টগ্রামের সুপ্রাচীন ইতিহাসের ধারণা থাকলেও সেরকম কোন নিদর্শন খুজে পাওয়া যায়নি। সীতাকুন্ডের পাহাঙী এলাকায় প্রস্তরযুগের কিছু অস্ত্রের নমুনা পাওয়া গেছে। চিনা পরিব্রাজক হিউওয়েং সাং থেকে শুরু করে মিশরীয় রাজা টলেমি পযন্ত চট্টগ্রামকে জানতেন। পারস্য কবি হাফিজ পূর্তগীজ নাবিক ভাস্কো দা গামাও চট্টগ্রামের নাম শুনে থাকবেন। আর ইবনে বতুতার সাথে চট্টগ্রামকে আলাদা করে পরিচয় করিয়ে দেয়ার প্রয়োজন নেই। আধুনিক কালেও এর পরিচিতি বেশ ভালো। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষি মিশন দেখতে বাংলাদেশেী সেনাদের সাথে একবার আফ্রিকার এক দেশে গিয়েছিলেন একজন বাংলাদেশী সাংবাদিক। আফ্রিকান এক যুবককে বাংলাদেশ সম্পর্কে কি জানে জানতে চাইলে সে রাজধাণী ছাড়া আরেকটা শহরের নাম বলেছিলো সেটা চট্টগ্রাম। প্রাচীন গ্রিক ও মিশরীয় ভৌগলিকদের বর্ণনায় চট্টগ্রামের কিছু স্থানের উল্লেখ পাওযা যাযইতিহাসবিদ ড. নলিনীকান্ত ভট্টাচার্য প্লিনিরপেরিপ্লাসের ক্রিসকে চট্টগ্রামের দ্বীপ সন্দীপ বলে দাবী করেছেন।

চট্টগ্রাম ভূখন্ড হিসেবে পুরনো এখানকার পাহাড়ে পুরনো শিলার সন্ধান পাওয়া গেছে। কিন্তু জনবসতি হিসেবে কতটা পুরনো এই নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে। তবে প্রশিদ্ধমত দুটি কারণে এর বয়সকে সমর্থন করে। প্রথমত চট্টগ্রাম শহরে চট্টশ্বরী মন্দির নামে একটি মন্দির রয়েছে ধারণা করা হয় হাজার বছর আগে থেকে এখান মা চট্টেশ্বরীর পূজা করা হয়। অনেকের মতে এই নাম থেকেই চট্টগ্রাম নামের উদ্ভব। চট্টগ্রামের সীতকুন্ডকে নিয়ে যে পুরানের আখ্যান রয়েছে এটাও চট্টগ্রামের পুরানত্ব সমর্থন করে। পুরান মতে দক্ষযজ্ঞের সময় অগ্নিকুন্ডে আত্মহুতি দেয়া মৃতা দক্ষরাজকন্যা সতির মৃতদেহ শিব ত্রিশুলে করে ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে দেন। এরকম ৫২টি স্থান সতিকুন্ড বা সীতাকুন্ড নামে পরিচিতি পায়। পৌরানিক ধারনা অনুযায়ী দূর্গার সে সময় নামছিলো সতি, তারই দেহের একটি অংশ এখানে এসে একটি কুন্ডে পড়ে। এখানে গিরিখাতের মধ্যে একটি জলাধার রয়েছে। হিন্দুদের বিশ্বাস মতে এখানেই তার দেহ পতিত হয়। সে মোতাবেক সনাতন ধর্মের লোকেরা একে তীর্থস্থান হিসেবে গন্য করে এবং এখানে প্রচুর লোকসমাগম হয়।

সমগ্র বাংলায় রাজনৈতিক কারণে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়নি এটা প্রতিষ্ঠিত সত্য। কারণ ত্রয়োদশ শতাব্দিতে এখানে মুসলিম শাষন প্রতিষ্ঠিত হলেও চতুর্শ শতকে মরক্কোর বাসিন্দা ইবনে বতুতা এ অঞ্চল ভ্রমনে এসে লিখেছেন এখান শাষক মুসলিম হলেও প্রজারা মূলত অমুসলিম। তবে যে কোণো ধারণা চট্টগ্রামের লোকেরা প্রথম গ্রহণ করে বলে একটা জনশ্রুতি আছে। এজন্য রাজনৈতিক ভাবে ইসলাম প্রতিষ্ঠার পূর্বে আরব বনিকরা ইসলাম প্রচার করেন। তবে আরব বনিকরা প্রথমদিকে ইসলাম প্রচার বা ইসলামের সাথে পরিচয় ঘটাতে পারেন কিন্তু বাংলার অন্যান্য এলাকার মতো এখানেও ইসলাম বিকশিত হয় এদেশের পীর ফকিরদের দ্বারা তথা সুফিজম ভিত্তিক ইসলামই এখানকার ইসলাম বিকাশে মূল ভূমিকা রাখে। ১৩৩৮ সালে সুলতান ফকরুদ্দিন মোবারক শাহ-এর চট্টগ্রাম বিজয়ের ফলে চট্টগ্রাম স্বাধীন সোনারগাঁও রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়।

পনের শতকের চট্টগ্রামের একটি বিবরণ পাওয়া যায় চীনা পরিব্রাজক ফেই-শিন এর ‘’শিং-ছা-শ্যাং-লান’’ নামের ভ্রমণ গ্রণ্থে। জালালউদ্দিন মুহাম্মদ শাহ-এর আমলে চীনা দূতদের মধ্যে ফেই-শিন ছিলেন। ১৪৩৬ খ্রীস্টাব্দে তিনি উক্ত বইতে চট্টগ্রাম সম্পর্কিত বর্ণনা দেন :
এই দেশটির উপসাগরের কূলে একটি সামুদ্রিক বন্দর আছে তার নাম চা-টি-কিয়াং। এভাবে হাজার বছর ধরে চট্টগ্রামই ছিলো এই বাংলার প্রবেশদ্বার। আর চট্টগ্রামের প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দর হলেও দেশের অন্যপ্রান্ত থেকে বা ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের দিকে যাওয়ার জন্য আপনাকে প্রবেশদ্বার হিসেবে গ্রহণ করতে হবে মিরশ্বরাই থানাকে। তবে মিরশ্বরাইকে চট্টগ্রাম মনে হবে না। সীতাকুন্ডে প্রবেশ করলে চট্টগ্রাম চট্টগ্রাম ভাবটা আসে।

Published : অক্টোবর ৩১, ২০১৬ | 1073 Views

  • img1

  • Helpline

    +880 1709962798