হেঁটে ৩০ হাজার কিলো পাড়ি দেয়া ওসমান গণির খবর কেউ রাখেনা

Published : অক্টোবর ২০, ২০১৬ | 2137 Views

পায়ে হেঁটে ২১ হাজার মাইল বা ৩০ হাজার কিলোমিটার

বাঙালী আরামপ্রিয় জাতি, কেউ কেউ অলসও বলে থাকেন। কিন্তু বাংলামায়ের সন্তানেরা বেশ কয়েকবার তাদের সক্ষমতার স্বাক্ষর রেখেছেন। কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুর উপজেলার ওসমান গনি তেমনই একজন লোক। তার কথা জানে না অনেকেই।  তিনি কাজটি করেছেন আজ থেকে ৪৫ বছর আগে। দীর্ঘ ৭ বছর ধরে পায়ে হেঁটে ২২টি দেশের ও ২১ হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়েছেন তিনি। ২১ হাজার মাইল পথ মানে প্রায় ৩০ হাজার কিলোমিটার । যেখানে গিনিচ বুক অফ রেকডে সর্বোচ্চ রেকড ২৪ হাজার কিলোমিটার। সেখানে ওসমান গনি হেঁটেছেন ৩০ হাজার কিলোমিটারের বেশী। বিশ্ব রেকর্ড থেকে আরো ছয় হাজার কিলোমিটার বেশী। তিনি হয়তো রেকর্ড এর কথা ভাবেননি। ভেবেছেন কেবল অভিজ্ঞতা অর্জন ও নিজের দেশের নাম রৌশনের কথা। কিন্তু আজ তার খবর আর কেউ রাখেনা। কোনো টিভি রেডিও এবং পত্রিকার পাতায় পাওয়া যায়না তার খবর। এই সংবাদের সাথে দেয়ার জন্য একটি ছবি সংগ্রহ করতে পারিন।

আজ নিভৃত পল্লীতে নিজগ্রামে পর্ণকুটিরে বসবাস করছেন আর আশি বছর বয়সে স্মৃতি হাতড়ে বেড়াচ্চেন সেইসব জ্বলন্ত দিনগুলোর যেগুলো তিনি পার করে এসেছেন। তখনকার যুগে মিডিয়ার মাতামাতি না থাকার কারণে আড়ালেই থেকে গেছেন এই মানুষটি। কিন্তু দেশবিদেশের কিছু পত্রিকার কাটিং ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের চিঠি বুকে আগলে রেখেছেন আজো।  কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারী উপজেলায় তার পৈত্রিক নিবাস। ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙ্গনে ভিটেমাটি হারিয়ে নি:স্ব হয়েই দীর্ঘদিন থেকে পরিবার পরিজন নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন উলিপুর উপজেলার তবকপুর গ্রামে শ্বশুড় বাড়ীতে। অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটছে তার।

image_1296_322999-gif১৯৬৪ সালের ২৭ এপ্রিল। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের টেকনাফ থেকে তিনি তার পদযাত্রা শুরু করেন। তারপর তেঁতুলিয়া পৌছেন।  তেঁতুলিয়া  থেকে একে একে ভারত, শ্রীলংকা, বার্মা, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, নেপাল, ইরান, ইরাক, সিরিয়া, লেবানন, জর্দান, মিশর,  বার্মা, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম, হংকং, ফরমোজা, ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়াসহ মোট ২২টি দেশ ২১ হাজার মাইঠ পথ হেঁটে  ভ্রমণ করেন।  জীবন থেকে ৭টি বছর তিনি এভাবে ব্যয় করেন। পথে খাবারের কষ্ট সয়েছেন। রোদে পুড়েছেন বৃস্টিতে ভিজেছেন, চুরি ছিনতাইয়ের কবলে পড়েছেন। টাকা পয়সা পাসপোর্ট সব হারিয়েছেন, খাবারের কষ্ট করেছেন, থাকার সমস্যায় পড়েছেন। বরফের টালি, মরুর বালি, নদীর জল, পাহাড়ের খাড়ি সব পাড়ি দিয়েছেন কিন্তু অসম সাহসী ও অফুরন্ত মনোবল সমৃদ্ধ ওসমানগনি দমে যাননি।

আজকের ৮০ বছরের বৃদ্ধ ওসমান গনি যখন স্কুলের ছাত্র, তখন সাইকেলে ভ্রমণকারী দুইজন ভূ-পর্যটকের সাথে তার দেখা হয় তার। তাদের কাছ থেকে দেশ বিদেশ ভ্রমণের  অভিজ্ঞতার কাহিনী শুনে সংকল্প আটেন তিনি পায়ে হেঁটে বিশ্বটা দেখবেন তারপর একদিন একটি চটের ব্যাগ আর কাগজপত্র নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। কাগজপত্র বলতে পাসপোর্টটা মাত্র। এই বিশাল কাজ সফল করার জন্য তার টাকা পয়সা কোনো কিছুর প্রয়োজন হয়নি। কেবল মনোবলই তাকে এই কাজ করতে সাহায্য করেছে। দেশে দেশে হাঁটার সময় তিনি অনেক বিপদ পাড়ি দিয়েছেন। অনেক কিছু হারিয়েছেন। মানুষের ভালোবাসাও পেয়েছেন, পেয়েছেন অনেক রাষ্ট্রপ্রধান, মন্ত্রী আমলার প্রতিশ্রুতি  কিন্তু জীবন সায়াহ্নে এসে কিছুই পাননি এই কর্মবীর।  ওসমান গনি কয়েকটি দেশের রাষ্ট্র প্রধানদের সাথে সাক্ষাৎ লাভ ও তাদের সাথে নৈশভোজের সুযোগ পান এসব স্মৃতিই এখন তার স্বান্তনা।

jarif74তার ভ্রমনের উপর একটি বই লিখেছেন তিনি। বইটি বহুবছর পর আলোর মুখ দেখেছে।
গত ২০০৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সাথে দেখা করে তিনি পান্ডুলিপি দেখালে পিএম এটি প্রকাশের জন্য ৬০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেন। কিন্তু যে মন্ত্রণালয়কে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তাদের গাফিলতির জন্য সেটা আর হয়নি।

ইরান ভ্রমনের সময় তিনি ঢাকাতির কবলে পড়লে একটি আর্তজাতিক সংস্থা তাকে ৩ হাজার ডলার অনুদান দেন। সেই টাকা তিনি তৎকালীন ইরানস্থ পাকিস্তান দূতাবসে জমা রাখেন। বহু চেষ্টার পর স্বাধীনতা যুদ্ধের পরে তিনি মাত্র ৮০ হাজার টাকা পান। বাদবাকী টাকা আর পাননি। পদে পদে লোকজন তাকে এভাবে ঠকিয়েছে।

আজ জীবনের শেষপ্রান্তে তিনি ভাবেন। দেশবিদেশে বাংলাদেশকে এভাবে তুলে ধরে তিনি যে গৌরব প্রতিষ্ঠা করেছেন তার বিনিময়ে শেষ জীবনে রোগশোকে ধুঁকে মরাই কি তার নিয়তি? নতুন প্রজন্ম তার কথা জানে না। বইটি প্রকাশ হলে কিছু তথ্য উপাত্ত থাকতো সেটাও হয়নি। নিজের লেখা পান্ডুলিপিটি এখনো বুকে আগলে রেখেছেন, শেষ বয়সে শুধু এখন এতটুকুই চাওয়া। যদিও ছবিগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। নষ্ট হয়ে গেছে নেগেটিভগুলোও।

সূত্র: সামহোয়ার ইন ব্লগ ও দৈনিক সমকাল

তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ জয়

লেখা: জাহাঙ্গীর আলম শোভন

Published : অক্টোবর ২০, ২০১৬ | 2137 Views

  • img1

  • Helpline

    +880 1709962798