নলদিয়া মেলা

Published : জুন ২৯, ২০১৬ | 1147 Views

নলদিয়া মেলা

বাংলাদেশের লোকজ মেলার সঠিক জন্ম কবে, কোথায়, কিভাবে তার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। গবেষকদের মতে, বাংলাদেশের মেলার ঐতিহ্য বহুকালের। মেলার আদিবৃত্তান্ত না জানা গেলেও ধারণা করা চলে যে, ধর্মীয় উপলক্ষেই এ দেশের মেলার জন্ম।

১৯২১ খ্রিস্টাব্দে তদানীন্তন ব্রিটিশ-বাংলায় জনস্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক সি.এ বেন্টলি তার ‘ফেয়ার অ্যান্ড ফেস্টিভ্যাল ইন বেঙ্গল’ গ্রন্থে (১৯২১) পুরো বাংলায় প্রায় সাড়ে সাত হাজার মেলার বিবরণ দিয়েছিলেন। বিসিক রচিত পূর্যোক্ত বাংলাদেশের মেলা গ্রন্থে মোট ৪০০৫টি মেলার বিবরণ পাওয়া যায় বর্তমান বাংলাদেশে। বাংলাদেশের মেলার বর্তমান জরিপ করলে তা দশ-বার হাজারে গিয়ে পৌঁছিবে। বিসিকের উক্ত বিবরণটিও অসম্পূর্ণ বলে মনে হয়। আইন-ই আকবরীতে আছে ‘এদেশে এমন কোন গ্রাম নেই যেখানে মেলার ধুম পড়ে যায় না। আবার সারাদেশে প্রায় ১০৫০টি মেলা অনুষ্ঠিত হয় বলে এক পরিসংখ্যানে জানা যায়। তবে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থার জরিপে মোট মেলার সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে ১০০৫টি। এসব মেলার প্রায় নব্বই ভাগই গ্রামীণ লোক মেলা। সারা বছরই বাংলাদেশের কোন না কোন স্থানে মেলা বসে ভিন্ন ভিন্ন উপলক্ষকে কেন্দ্র করে।

আধ্যাত্মিক পুরুষ দেওয়ান ফকির আবদুর রশিদ (রহ.) এর ওফাত দিবস উপলক্ষে  ফেনী  ও নোয়াখালী জেলার মিলনস্থল দাগনভূঞা উপজেলার ইয়াকুবপুরে দীর্ঘদিন ধরে বছরের ১ মাঘ থেকে সপ্তাহব্যাপি এ মেলার আয়োজন হয়ে আসছে। অষ্টাদশ শতাব্দির শেষের দিকে আধ্যাত্মিক পুরুষ দেওয়ান ফকির আবদুর রশিদ (রহ.) ইসলাম প্রচারের উদ্যেশ্যে এ অঞ্চলে আগমন করেন। পরবর্তীতে তিনি সেখানে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করা শুরু করেন এবং তার দীক্ষায় বহু মানুষ সেখানে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। কালক্রমে তিনি ইন্তেকাল করলে তার ভক্ত মুরিদানরা বিগত ১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দে প্রথমবারের মত বার্ষিক ওরস মাহফিলের আয়োজন করে। ওরশ মাহফিলকে ঘিরে সেখানে দোকান পাট বসতে থাকে এবং দুতিন বছরের মাথায় সেটি মেলায় রুপান্তরিত হয়। শুরুতে ওরসকে ঘিরে দোকান পাট ও মেলার উৎপত্তি ঘটলেও বর্তমানে ওরস আয়োজনের নেই কেউই।

প্রতিবছর চলে আসা মাসব্যাপী উক্ত নলদিয়া মেলা বৃহত্তর নোয়াখালীর মধ্যে দ্বিতীয় সর্ববৃহৎ। প্রতিবছর এ মেলায় লক্ষ লক্ষ লোকের সমাগম ঘটতো। নলদিয়া মেলা উপলক্ষে মেলা সংলগ্ন এলাকার বাড়ী ঘরে ঈদের মত পরিবেশ থাকতো। প্রবাসীরা পর্যন্ত এ সময় ছুটি নিয়ে বাড়ী চলে আসতো। অথচ ২০০ বছরেরও বেশী সময় ধরে চলা ঐতিহ্যবাহী এ মেলা গত কয়েক বছর যাবত বিভিন্ন কারনে ভাটার মধ্যে রয়েছে।  এই এলাকার একসময়ের পীর হাফেজ মাওলানা দেওয়ান আবদুর রশিদ এর ওফাত দিবস উপলক্ষে প্রতিবছর ১ মাঘ এ মেলা শুরু হয়। ১০ থেকে ১৫ দিনের অনুমতি পেলেও ১ মাস পর্যন্ত গড়ায় এ মেলা। ফেনী-নোয়াখালীর বিখ্যাত হোটেলগুলো এসে এ মেলাকে যেমন আলোকিত করতো তেমনি যাত্রা, সার্কেস, নাগরদোলা, শিশুদের পুতুল নাচ, খেলনা দোকান, সাগরের বড় বড় মাছ এবং ঐতিহাসিক কাঠের ফার্ণিচার এ মেলার প্রধান বাণিজ্য ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ মেলায় সীমাহীন জুয়ার আসর, মদ, যাত্রার নামে অশ্লীল নৃত্য প্রদর্শন এবং চাঁদার ভাগ ভাটোয়ারা নিয়ে গ্রুপে গ্রুপে সংঘর্ষ বেড়ে যাওয়ায় মেলার সুনাম সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে।

কখনো কখনো বাংলা ১ মাঘ থেকে নলদিয়া মেলা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও সে সময়ে প্রতিপক্ষরা পৃথক ৩টি কমিটি জমা দেয়ায় মেলার অনুমতি দেয়না জেলা প্রশাসন। অনুমতি না মিললেও তখন থেকেই ভিন্নভাবে চল-চাতুরির আশ্রয় নেয়ার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকে সুবিধাভোগীদের। ১৯৯৬ সালে মেলায় ডাকাতি হামলায় বেশ কয়েকজন নিহত, পুলিশের অস্ত্র লুট  হয়। দুইজেলার  দুই উপজেলার বাসিন্ধাদের বিরোধের জের ধরে গত কয়েক বছর প্রথমে জেলা প্রশাসন মেলার অনুমতি না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও মেলার সঙ্গে সংশি¬ষ্ট ব্যক্তিরা নিজেদের স্বার্থ হাসিলে কখনো বস্ত্র ও তাঁত মেলা আবার কখনো বা কাঠ ও ফার্ণিচার মেলা নামে এ মেলার অনুমতি নেয়।কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বর্তমানে জুয়ার আসর বসে। মদ বিক্রি হয় অবাদে। ১৯৯৬ সালের পর থেকে এমন অনিয়ম হয়ে আসছে। এর আগে শত শত বছর ধরে একই নিয়মে হয়ে আসছে এই মেলা। হাজার হাজার ব্যবসায়ী প্রতি লাখো লাখো মানুষের কাছে তাদের পন্য বিক্রি করেছে। ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ই হাসিমুখে ঘরে ফিরে গেছে। বর্তমানে লুটপাট চাঁদাবাজি ছাড়াও মানুষের জীবন হুমকির মুখে পড়েছে। বিশ্বাসীরা মনে করেন এটা বাবা দেওয়ান শাহের অভিশাপ। নব্বইয়ের দশকে অশ্লীল নৃত্য ও বেহেল্লাপনা করে েএকটি স্বার্থান্বেসি মহল মেলাকে ধীরে ধীরে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে।

Published : জুন ২৯, ২০১৬ | 1147 Views

  • img1

  • জুন ২০১৬
    সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
    « জুলাই   জুলাই »
     
    ১০১১১২
    ১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
    ২০২১২২২৩২৪২৫২৬
    ২৭২৮২৯৩০  
  • Helpline

    +880 1709962798